'ও মা, বাবায় দুধ লইয়া আইত না?'

বিজ্ঞাপন
default-image

চারপাশে টিনের চারটি খুপরি। মাঝখানের ছোট্ট উঠানে বসে বিলাপ করে যাচ্ছেন সোমা বেগম। বলছেন ভাই হারানোর যন্ত্রণার কথা। আর, ছেলে হারানোর শোকে সকাল থেকেই দরজার চৌকাঠে বসে এক দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ সোহরাব হোসেন (৭০)। যেন পাথর হয়ে গেছেন। উঠানজুড়ে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। তাঁরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন স্বজনহারাদের। এত কিছুর মধ্যেও নির্বিকার ছোট্ট শিশু সাদিয়া। মায়ের কোলে বসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে সে। কখনো কখনো ফিক করে হেসে উঠছে। আবার ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। মায়ের গলা ধরে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করছে, ‘ও মা, বাবায় দুধ লইয়া আইত না?’

দুই বছরের এই শিশু এখনো বুঝতে পারেনি, তার বাবা পাপ্পু মিয়া (২৯) দুধ নিয়ে আর বাড়ি ফিরবেন না কখনো। আদর করে তার কপালে চুমু খাবে না আর। শিশুটি না বুঝলেও নির্মম এই সত্য জানেন তার মা ইয়াসমীন বেগম। সে কথা মনে করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছিলেন বারবার। বলছিলেন, সোমবার সকালে ঢাকার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ার আগে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। বাবার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরলে কপালে চুমু খেয়ে মেয়েকে কথা দিয়েছিলেন, বাড়ি ফেরার সময় তার জন্য দুধ নিয়ে আসবেন। সে আশাতেই পথ চেয়ে আছে তাঁর শিশুকন্যা সাদিয়া।

মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নৈদিঘীর পাথর এলাকায় পাপ্পু মিয়াদের বাড়ি। গতকাল সোমবার সকালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের একজন তিনি।

default-image

স্ত্রী–সন্তান ছাড়াও বাবা, মা আর এক বোনকে নিয়ে সংসার ছিল পাপ্পুর। বড় দুই ভাইয়ের আলাদা সংসার হলেও ভাইদের মধ্যে মিল ছিল। বাড়ির কর্তা বৃদ্ধ সোহরাবের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে পাপ্পু ছিলেন সবার ছোট। অভাবের সংসারে পড়াশোনা হয়নি। কৈশোরেই তাই বাবা ও বড় দুই ভাইয়ের পথ ধরে শুরু করেছিলে হকারির কাজ। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৌসুমি ফল কিনে এনে কখনো মুন্সিগঞ্জের পথেঘাটে, আবার কখনো তা ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার লঞ্চে বিক্রি করতেন। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে লঞ্চে লঞ্চেই হকারি করে কেটেছে। এরই মধ্যে ছয় বছর আগে পাশের গ্রামের মেয়ে ইয়াসমিনের সঙ্গে পাতেন সংসার।

ছলছল চোখে সে কথাই বলছিলেন পাপ্পুর বড় ভাই শামীম মিয়া। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁদের এলাকায় অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে ফল হকারি করে আসছেন। দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হলে আর সবার মতো পাপ্পুও ব্যবসা ছেড়ে ঘরে বসে কাটিয়েছেন। সারা দেশে লকডাউন শিথিল হলে কয়েক দিন আগে থেকে আবারও ব্যবসা শুরু করেন পাপ্পু। রোজকার নিয়মমতো সোমবার সকালেও ঘর ছাড়েন। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততায় যাওয়ার সময় উঠান পর্যন্ত তাঁকে এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানান পরিবারের সদস্যরা। রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে পাপ্পুকে বিদায় দেওয়ার সময় তাঁদের কেউ কি ভেবেছিলেন, এই বিদায়ই পাপ্পুর শেষ বিদায় হবে?

default-image

পাপ্পু ফিরবে না—সে কথা জানে তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সন্তান হারানোকে তাই ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নিয়েছেন পাপ্পুর বৃদ্ধ মা। তবে স্ত্রী ইয়াসমীন কেবল ভাগ্যকে দোষ দিতে নারাজ। ইয়াসমীনের কণ্ঠে তাই ক্ষোভ। অবুঝ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই ইয়াসমীন বলেন, এমন ঘটনা কেবল দুর্ঘটনা না। লঞ্চচালকদের অসচেতনতাই তাঁর স্বামীকে তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি আর যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, আর কোনো স্ত্রী বিধবা না হন, সন্তান বাবা না হারায়, সে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান ইয়াসমীন।

আরও পড়ুন: 
বুড়িগঙ্গায় ভেসে উঠল আরেক লাশ, মৃত বেড়ে ৩৪

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন