'করোনা'-শঙ্কার মধ্যেই এগোচ্ছে পদ্মা সেতুর কাজ

বিজ্ঞাপন

সোলায়মান খান। ৩০ বছর বয়সী এই যুবক পদ্মা সেতু প্রকল্পের চালক। বাড়ি তাঁর বাগেরহাট জেলায়। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর পরপরই ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় রয়েছেন তিনি। চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন মাওয়ার পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে সোলায়মান খান শুধু ভেবেছেন, এই নদীর এত স্রোত। প্রচণ্ড ঢেউয়ের কারণে বড় বড় নৌযান চলতেও হিমশিম খায়। আবার বর্ষার পানি কমে শীতকাল এলে নদীর বুকে বড় বড় চর পড়ে। এই নদীর ওপর কীভাবে এত বড় সেতু নির্মাণ করা হবে? প্রশ্নটি বারবার মনের ভেতর জাগত সোলায়মানের। কিন্তু উত্তর মিলত না তাঁর। সময় যত গড়াচ্ছে, সোলায়মান খানও সেই প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন। পাঁচ বছর আগে যা ছিল তাঁর কাছে স্বপ্ন, সেটি এখন অনেকটাই বাস্তব। প্রতিদিন একাধিকবার মাওয়ার দোগাছীতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কার্যালয় থেকে কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে যাওয়ার সময় পদ্মাপাড়ে তাকান। আর নদীর ওপর বসানো স্প্যানগুলো দেখে সোলায়মান বলেন, ‘পদ্মা সেতু তো হয়েই গেল।’ তাই সোলায়মান খানের ইচ্ছা, উদ্বোধনের দিনই গাড়ি চালিয়ে যাবেন মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরায়।’

পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। প্রতিদিনই একটু একটু করে কাজ এগোচ্ছে। এই সেতু নির্মাণে শুরু থেকেই নানা বাধাবিপত্তি এসেছে। এ কারণে সেতু নির্মাণ পিছিয়েছে। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস। করোনার কারণে সেতু নির্মাণের কাজ কিছুটা পেছাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর মধ্যেই কাল মঙ্গলবার বসছে সেতুর ২৬তম স্প্যান।

default-image

পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চীনা কর্মীরা কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড়া পেয়ে কাজে যোগ না দিলে সেতুর কাজে দেরি হতে পারে। তা ছাড়া চীন থেকে যন্ত্রাংশ সময়মতো না এলেও সমস্যা হবে। এখনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দু-এক সপ্তাহ পর এর প্রভাব কিছুটা পড়তে পারে।

৩ মার্চ সকালে সোলায়মান খানের সঙ্গে মাওয়ায় দেখা হয়। সেতুর এক নম্বর পিয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ডান হাত সোজা করে তিনি বলেন, ‘দেখেন। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারবেন পদ্মা সেতু দেখতে কেমন হবে। আর কদিন পরই পুরো সেতু চোখের সামনে ভেসে উঠবে।’

default-image

সোলায়মান খান জানান, প্রকল্পের অধীনে অস্থায়ী চাকরি। সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেই মাওয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। নতুন কোনো চাকরি করতে হবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে খারাপ লাগবে না? প্রশ্ন করতেই সোলায়মান খান বলেন, ‘খারাপ লাগবে কেন! এটি তো একটি স্বপ্ন। শুধু আমার না। সবার স্বপ্ন। আমি বাগেরহাট জেলার মানুষ। বাড়ি যেতে কত কষ্ট হতো। দীর্ঘ সময় লাগত বিশাল এই নদী পার হতে। পদ্মা সেতু হলে আমি দশ মিনিটে নদী পার হতে পারব। বাগেরহাট যাব তিন ঘণ্টায়। ভাবা যায়!’

default-image

সোলায়মান খানের সঙ্গে স্পিডবোটে করে ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে মাওয়া থেকে জাজিরার দিকে রওনা দিতে হয়েছিল। সেদিন সকালের দমকা হাওয়ার সঙ্গে একপশলা বৃষ্টিও হয়েছিল মাওয়ায়। কালো মেঘ বিলীন হয়ে এরপর নীল আকাশ থেকে ছড়িয়ে যায় ঝলমলে রোদ। নদীও হয়ে যায় বেশ শান্ত। ঘাট ছেড়ে ছোট ছোট ঢেউয়ের মধ্যে স্পিডবোটটি চলা শুরু করল জাজিরার দিকে। ঘাট থেকে দেখা গেল সেতুর খণ্ডিত রূপ। কারণ, ২৬টি পিয়ারের (খুঁটি) ওপর বসেছে ২৫টি স্প্যান। চার খণ্ডে ভাগ হয়ে স্প্যানগুলো বসানো হয়েছে। দূর থেকে মনে হবে, ছোট-বড় চারটি চিরুনি উল্টো করে প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর গাঁথা রয়েছে। স্পিডবোটটি যতই জাজিরার দিকে যেতে লাগল, দূরে থাকা পদ্মা সেতুর পিয়ারগুলোও যেন কাছে চলে আসতে থাকল। একটি কিংবা দুটি নয়, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা সেতুর ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ৩৯টি পিয়ার গেঁথে আছে নদীর ওপর। প্রতিটি পিয়ারের নিচের দিকে নম্বর লেখা আছে।

default-image

মাঝনদীতে থাকা ১০, ২৬ ও ২৭ নম্বর পিয়ারগুলোও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ১০ নম্বর পিয়ারটি গত ৮ মার্চ পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গেছে। ২৬ নম্বর পিয়ারের সঙ্গে পন্টুন বাঁধা আছে। এর সঙ্গে একটি বড় নৌযান। যেখান থেকে পিয়ারে উঠে শ্রমিকেরা কাজ করছেন। কেউবা নৌযানে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। পন্টুন থেকে পিয়ারের মাথায় উঠতেই বোঝা গেল, নদীর পানি যেখান থেকে বয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে একেকটি পিয়ার প্রায় ১০ তলা ভবনের মতো উঁচু হবে। এর ওপর বসানো হবে স্প্যান। তাহলে এত্ত বড় এই পদ্মা সেতু। ২৬ নম্বর পিয়ার থেকে পদ্মা সেতুর বিশালতা চোখে পড়ল। এই পিয়ার ক্যাপ (শেষ স্তর) এ মাসেই ঢালাই দেওয়া হবে। মোটা মোটা রড বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। সিমেন্ট-পাথরের ঢালাই হবে কয়েক দিন পরই। ২৬ নম্বর পিয়ারে কাজ করছেন কয়েকজন চীনা প্রকৌশলী। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। ভাষার আদান-প্রদান চলছে। কখনো আবার ইশারায় মনের ভাব বুঝে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন বাংলাদেশি ও চীনারা। তবে চীনা ভাষা বেশ রপ্ত করেছেন মো. রাকিব হোসেন নামে দেশীয় এক শ্রমিক। রাকিব হোসেন বলেন, ‘২০১৫ সালে প্রথমে ৩৭ নম্বর পিয়ারের কাজ শুরু করি। এরপর আরও ১০-১২টি পিয়ারে কাজ করছি। প্রথমে চীনা ভাষা বুঝতাম না। এখন অনেকটাই বুঝতে পারি। ওরা আমাদের মতো কথা বলে না। একটি শব্দ বলে বোঝায় কী করতে হবে।’

default-image

২৬ নম্বর পিয়ার থেকে প্রায় ৫০০ ফুট দূরে ২৭ নম্বর পিয়ারের কাজও একইভাবে চলছে। পাশে ২৮ নম্বর পিয়ার নির্মাণ শেষ হয়ে গেছে। ২৯ নম্বর পিয়ার থেকে টানা ৪২ নম্বর পিয়ার পর্যন্ত ১৩টি স্প্যান বসানো হয়েছে। স্প্যান বসিয়েই সেতুর কাজ থেমে যায়নি। দ্বিতল পদ্মা সেতুর মাঝখান দিয়ে চলবে ট্রেন। আর ওপর দিয়ে সড়কপথে চলবে যানবাহন। এ জন্য স্প্যানের মাঝখানে বসানো হচ্ছে রেলওয়ে স্ল্যাব। আর ওপরে বসানো হচ্ছে রোডওয়ে স্ল্যাব। স্ল্যাবগুলো তৈরি করে ক্রেন দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্প্যানের ওপর।

তবে জাজিরায় চরের ওপর ৪২ নম্বর স্প্যানের কাছে ভায়াডাক্ট (সেতুতে ওঠার পথ) দিয়ে সেতুর এই অংশে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তাই স্টিলের অস্থায়ী সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। এই সিঁড়িও ১০ তলা ভবনের সমান উঁচু। সিঁড়ি ভেঙে ওপরের দিকে ওঠার সময় নিচে তাকালেই মাথা ঘুরিয়ে যাওয়ার দশা। কিন্তু নির্মাণশ্রমিকেরা ভারী যন্ত্রাংশ কাঁধে বা হাতে নিয়ে দিব্যি উঠে যাচ্ছেন। চারতলায় ওঠার পর জানা গেল, এখানেই বসানো হচ্ছে রেললাইনের জন্য রেলওয়ে স্ল্যাব। পুরো পদ্মা সেতুর জন্য প্রয়োজন হবে ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাব। এর মধ্যে বসে গেছে ৬৯০টি স্ল্যাব। সেতুর এই অংশে বেশ নীরবতা চোখে পড়ল। তবে কাজ থেমে নেই। মাঝারি আকারের একটি ট্রাকে করে স্ল্যাবগুলো নিয়ে বসানো হচ্ছে। শ্রমিকেরা জানান, একসঙ্গে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো যায়। সব স্প্যান বসানো হলে রেলের স্ল্যাবও দ্রুত বসবে। এরপর কংক্রিটের ঢালাই দেওয়া হবে। সব শেষে রেললাইন বসবে। এই রেলপথ দিয়ে একটি ট্রেন চলবে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে।

default-image

রেলপথ বসানোর অংশ থেকে আবার সিঁড়ি পেরিয়ে ছয়তলার সমান উঁচুতে পাড়ি। এখানেও একই অবস্থা। ওপরে রয়েছে একটি ট্রাক। ব্যাটারিচালিত ছোট একটি রিকশাও রয়েছে। প্রকৌশলীরা দ্রুত চলাচল করেন। কারণ, রোডওয়ে স্ল্যাব বসানোর কারণে সড়কপথও দীর্ঘ হচ্ছে। স্ল্যাব বসানোর সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর ওয়াটার প্রুফিং কেমিক্যালের প্রলেপ দেওয়া হবে। এরপর হবে পিচঢালাই। ২২ মিটার প্রস্থের পদ্মা সেতুর সড়কপথ হবে চার লেনের। বড় আকারে চারটি যানবাহন একসঙ্গে এই চার লেন দিয়ে আসা-যাওয়া করতে পারবে।


পদ্মা সেতুর রোডওয়ে স্ল্যাব বসানোর সড়কপথের মধ্যে ডিভাইডার আর দুপাশে রেলিং বসানো হবে। এর সঙ্গে বসবে সড়কবাতির খুঁটি। তবে জজিরা থেকে পদ্মা সেতু অনেকটা ইংরেজি ‘এস’ বর্ণের মতো বেঁকে মাওয়ার দিকে চলে গেছে।

সেতু দিয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে অপেক্ষা করতে হতে পারে আরও দেড় বছর। এমন কথাই বলছে সেতু কর্তৃপক্ষ। ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ২৫টি বসে গেছে এরই মধ্যে। আর মাত্র ১৬টি স্প্যান চলতি বছরেই বসানোর লক্ষ্যে কাজ করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। নকশা–জটিলতা কাটিয়ে এক বছর ধরে তাই দ্রুত এগোচ্ছিল পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। ঠিক তখনই চীনের করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে। এ কারণে দুটি স্প্যানসহ বেশ কিছু যন্ত্রাংশ আটকে পড়েছে দেশটিতে। আটকা পড়েছেন ১৭২ চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিক। তাই প্রকল্প–সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে চলে এলে পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে নিতে বড় বাধা থাকবে না। তবে দুটি স্প্যান বাংলাদেশে না আসাই ‘বিগ ফ্যাক্টর’ বলে মনে করছেন তাঁরা।

একনজরে পদ্মা সেতুর কাজ

• পুরো পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩০ কিলোমিটার। পানির ওপর থাকবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। বাকি ৩ দশমিক ১৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট থাকবে ডাঙায়।

• নদীর ওপর সেতুর ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ৪০টি প্রস্তুত হয়ে গেছে।

• ৪২টি পিয়ারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এর মধ্যে ২৫টি স্প্যান বসেছে। পদ্মা সেতুর দৃশ্যমান ৩৭৫০ মিটার অংশ।

• ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ৩৯টি দেশে এসেছে।

• চলতি বছরের নভেম্বরে বসবে সবশেষ ৪১তম স্প্যান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন