যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিল কপালিয়ায় প্রস্তাবিত জোয়ারাধার (টিআরএম-টাইড্ল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্যর্থতার পর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জোয়ারাধার প্রকল্প চালুর অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। সে অনুযায়ী কার্যাদেশও দেওয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাউবোকে প্রকল্পের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি চালু নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার চালু না হওয়ায় এবং এলাকার কোনো বিলে বর্তমানে জোয়ারাধার না থাকায় ভবদহ অঞ্চলের পানিনিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম শ্রী, হরি, টেকা ও মুক্তেশ্বরী নদীতে জমছে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি।
অভয়নগরের দত্তগাতী গ্রামের কৃষক আবদুল আজিজ বলেন, ‘মাত্র এক মাসে গাঙ তিন ফুট বুজে গেছে। এই অবস্থা চলতি থাকলি কোনোভাবেই গাঙ আর বাঁচপে না। বিলি পানি ঢুকলি তা আর বেরোচ্ছে না।’
উপজেলার কালিশাকুল গ্রামের গোবিন্দ মণ্ডল বলেন, এত দিন টিআরএম ছিল বলে নদী বেঁচে ছিল। এলাকায় জলাবদ্ধতা ছিল না। টিআরএম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদী পলিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দুই-তিন মাসের মধ্যে টিআরএম না হলে গোটা এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে।
পাউবো সূত্র জানায়, জোয়ারাধার চালু হোক, তা এলাকার কেউ কেউ চায় না। এ কারণে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার চালুর জন্য আবেদন জানায় পাউবো। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১২ মে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে বিষয়টির অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ১৫ মে সেনাবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট লিমিটেডকে (বিডিপিএল) জোয়ারাধার নির্মাণের কার্যাদেশ দেয় পাউবো। ২২ নভেম্বর চিঠি দিয়ে পাউবোকে প্রকল্প এলাকায় কাজের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির অনুরোধ জানায় বিডিপিএল। মূলত তখনই জোয়ারাধার চালুর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পাউবো যশোরের নির্বাহী পরিচালক অখিল কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বিডিপিএল প্রকল্পের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে আমাদের চিঠি দিয়েছে। এ অবস্থায় জোয়ারাধার চালুর ব্যাপারে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। বারবার সরেজমিনে ছুটে যাচ্ছি, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না।’
জোয়ারাধার কী: মূল নদীসংলগ্ন যেকোনো একটি নির্বাচিত বিলের তিন দিকে পেরিফেরিয়াল বাঁধ নির্মাণ করে অবশিষ্ট দিকের একটি অংশ উন্মুক্ত করে বিলে জোয়ারভাটা চালু করা হয়। এটাই জোয়ারাধার নামে পরিচিত। জোয়ারাধার চলাকালে ওই বিলে কোনো ফসল হয় না। কিন্তু অন্য বিলগুলোতে জলাবদ্ধতা থাকে না, নদী নাব্যও হয়। ফলে সেসব বিলে ফসল হয়।
বিল খুকশিয়ায় জোয়ারাধার বন্ধ: ২০০৬ সালে কেশবপুর উপজেলার বিল খুকশিয়ায় তিন বছর মেয়াদি জোয়ারাধার চালু করা হয়। ২০০৮ সালে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা অব্যাহত থাকে। এ সময় বিলে কোনো ফসল হয়নি। বিলে জমি রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি কৃষকের। কিন্তু ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হয় মাত্র এক হাজার কৃষককে। এঁদের অর্ধেকও ক্ষতিপূরণ পাননি। পরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে গোরসয়ালে হরি নদের সঙ্গে বিল খুকশিয়ার কাটিং পয়েন্ট বেঁধে দেন। বন্ধ হয়ে যায় জোয়ারাধার।
চালু হয়নি বিল কপালিয়ার জোয়ারাধার: বিল খুকশিয়ার পর দ্বিতীয় বিল হিসেবে অভয়নগর ও মনিরামপুর উপজেলায় অবস্থিত বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার চালুর চেষ্টা চালায় পাউবো। সিদ্ধান্ত হয় অগ্রিম ক্ষতিপূরণ দেওয়ার। টাকাও বরাদ্দ হয়। কিন্তু বিলের বেশির ভাগ কৃষক ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেননি।
জোয়ারাধারের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান: বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছে ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসন সংগ্রাম কমিটি নামের একটি সংগঠন। ওই কমিটির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর নাব্যতা থেকে বিল কপালিয়া উঁচু। জোয়ারের পানি বিলে উঠবে না। তা ছাড়া বিলে বারোয়ারি ফসল ধান, মাছ ও সবজির চাষ হচ্ছে। সুতরাং এই বিলে আমরা টিআরএম চাই না। যে বিলে ফসল হয় না, ওই বিলে টিআরএম হোক।’
কিন্তু ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে টিআরএমের কোনো বিকল্প নেই। বিল কপালিয়ায় কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে টালবাহানা করছে সরকার, প্রশাসন ও পাউবো। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন কতিপয় ঘেরমালিক এবং অর্পিত ও খাসজমির দখলদারেরা। তাঁরা কৃষকদের টিআরএমের বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছেন।
কর্মকর্তারা যা বললেন: ‘ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকায় জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প’-এর পরিচালক হলেন পাউবো খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যশোর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল) জুলফিকার আলী হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার চালু হবে কি না, তা আমি জানি না। এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
জুলফিকার আলী বলেন, আগামী ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন