'বুড়ি তিস্তা বাঁচলে উলিপুর বাঁচবে'

কুড়িগ্রামের উলিপুরে বুড়ি তিস্তা নদী ভরাট করে বিপণিবিতান নির্মাণ করা হয়েছে। এর পাশে মাটি খনন করে পুকুর তৈরি করা হচ্ছে। ছবিটি সম্প্রতি উলিপুর পৌরসভা এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো
কুড়িগ্রামের উলিপুরে বুড়ি তিস্তা নদী ভরাট করে বিপণিবিতান নির্মাণ করা হয়েছে। এর পাশে মাটি খনন করে পুকুর তৈরি করা হচ্ছে। ছবিটি সম্প্রতি উলিপুর পৌরসভা এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর সদরে ২ মে সন্ধ্যায় একটি মিছিল হয়। এতে প্রায় শ দুয়েক মানুষ অংশ নেয়। মিছিলের স্লোগান ছিল, ‘বুড়ি তিস্তা বাঁচলে উলিপুর বাঁচবে’, ‘নদীর মুখে বাঁধ কেন প্রশাসন জবাব চাই’, ‘থেতরাই থেকে কাচকোল আনব মোরা পানির ঢল’ ইত্যাদি। এই মিছিলের আয়োজন করে রেল, নৌযোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির উলিপুর শাখা।
নদীর উৎসে স্থায়ী বাঁধ এবং পরবর্তী সময়ে নদীর মধ্যে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, অবৈধ দখলের কারণে বুড়ি তিস্তা এখন মৃতপ্রায়। এই নদী উদ্ধারে ৫ মার্চ থেকে আন্দোলন শুরু করেছে গণকিমিটি। আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে স্থানীয় উলিপুর প্রেসক্লাব। এতে যুক্ত হয়েছে এলাকার সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক দলের কর্মীরা সরাসরি আন্দোলনে জড়িত না হলেও কেউ বিরোধিতা করছে, এমন শোনা যায়নি।
বুড়ি তিস্তা তিস্তার একটি শাখা নদী। ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর উৎপত্তি রাজারহাট উপজেলার থেতরাই থেকে। এরপর উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাচকোল দিয়ে ব্রহ্মপুত্রে পড়েছে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পরিমল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘উলিপুর জনপদ গড়ে উঠেছে বুড়ি তিস্তার তীরে, বুড়ি তিস্তাকে কেন্দ্র করে। ছোট এই নদীটি বিপর্যস্ত বলে এলাকার পরিবেশে নানা নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। নদীটি যদি একেবারে মরে যায়, তাহলে এই জনপদের সমৃদ্ধি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
খেওয়ারপাড় পুলটি উলিপুর বাজারের মাঝামাঝি। ২ মে দুপুরে উলিপুর বাজারে গিয়ে চোখে পড়ে, পুলের নিচে বুড়ি তিস্তা। পুলের দেড় থেকে দুই শ মিটার পূর্বদিকে গিয়ে নদী শেষ, শুধুই ধানখেত। তার আগে নদী দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কিন্ডারগার্টেন, মোটর গ্যারেজ। পুলের পশ্চিম দিকে জনৈক প্রভাবশালী পাকা বাড়ি তুলছেন, একটু দূরে মাদ্রাসা।
হাট আর পাট উলিপুরের ঐতিহ্য। নদীকেন্দ্রিক হাট আর নেই। পাটের উৎপাদন কমেছে। নদীতে পানি না থাকার কারণে কৃষক পাট পচাতে পারেন না। পাট যা বিক্রি হচ্ছে তা নিম্নমানের। হেলেঞ্চা, কলমি এসব এলাকায় কম দেখা যায়। বড় গাছ কমেছে। পাখপাখালি কমেছে। এসব এলাকার মানুষের কথা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি স্লুইসগেট ছিল থেতরাইয়ে। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় ওই গেট ভেঙে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন গেট তৈরি না করে বুড়ি তিস্তার মুখে বাঁধ দেয়। স্থায়ীভাবে নদীর প্রবাহ বন্ধ করা হয়। এরপরের ইতিহাস দখলের। কোথাও নদীতে পুকুর তৈরি করে মাছ চাষ হচ্ছে। কোথাও বেসরকারি কলেজ।
বাঁধ অপসারণ, স্লুইসগেট নির্মাণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আন্দোলনকারীরা কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে স্মারকলিপি দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতিমধ্যে দু-একজন অবৈধ দখলদারকে নদীর জায়গা ছেড়ে দিতে নোটিশ দিয়েছে। স্লুইসগেট নির্মাণেরও মৌখিক আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু উলিপুরের মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
নারিকেলবাড়ি কাজীরচক গ্রামের বিপ্লব রায়, বৃদ্ধ মো. আজিজুর রহমান বুড়ি তিস্তা আন্দোলনের সঙ্গে আছেন। বিপ্লব বলেন, ‘নদীতে বাঁধ রাখা যাবে না। এটাই আমাদের কথা।’ বৃদ্ধ আজিজুর বলেন, ‘আগে বুড়ি তিস্তায় যে স্রোত ছিল, সেই স্রোত আবার চাই।’