'সিলিন্ডার দিন, অক্সিজেন পৌঁছে দেব'

বিজ্ঞাপন

কোভিড–১৯–এর সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়টি হচ্ছে যখন অসুস্থ ব্যক্তির শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এ কারণে কোভিড–১৯ বললেই দমবন্ধকর অবস্থাটিই প্রকট হয়ে ওঠে। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসে। যেন শব্দটি শোনামাত্রই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর হয়, তাদের দ্রুততার সঙ্গে কৃত্রিম শ্বাস–প্রশ্বাস দিতে হয়। আর মধ্যম পর্যায়ের আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়। ফলে কোভিড–১৯–এর এই সময়ে অক্সিজেন নিয়ে একধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছে। এই হাহাকারের কারণটি মূলত অক্সিজেন সরবরাহ যন্ত্রের স্বল্পতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ‘সিলিন্ডার দিন, অক্সিজেন পৌঁছে দেব’ স্লোগানকে সামনে রেখে কাজ করছে ‘সংযোগ: কানেক্টিং পিপল’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন শিক্ষার্থী আহমেদ জাভেদ জামালের উদ্যোগে আবু আহমেদ মোবাশ্বেরুল করিম ও রেজওয়ান আহমেদ নূর সাড়া দিলে যাত্রা শুরু হয় ফেসবুক গ্রুপ সংযোগের। এটা অবশ্য মার্চের শুরুর দিকের কথা, যখন বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জামের (পিপিই) অভাবে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ থেকে শুরু করে জরুরি সেবায় নিয়োজিত সবাই হতাশা ব্যক্ত করছেন। এই সংকটই মূলত সংযোগের নির্মাতা। এখন পর্যন্ত এই গ্রুপের তৎপরতায় বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি হাসপাতাল, পুলিশ, সাংবাদিকসহ নানা পেশাজীবী মানুষের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি পিপিই বিতরণ করা হয়েছে। এই গ্রুপের মূল ভাবনা বলতে গিয়ে আহমেদ জাভেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের রিসোর্সের অভাব নেই। অভাব যা, তা হলো চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যথাযথ সেতুবন্ধনের।’

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক কোভিড–রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এখনো করোনা পরীক্ষায় ঘাটতি রয়েছে যথেষ্টই। তারপরও এই রোগীসংখ্যা বৃদ্ধি এক নতুন আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। এ বিষয়ে আহমেদ জাভেদ বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা অনেক কম করতে পারছি। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের হাসপাতালগুলোয় থাকা রোগীর চেয়ে ঘরে থাকা রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা।’

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কোভিড–১৯ রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অক্সিজেনের চাহিদাও বেড়ে গেছে। বড় বড় হাসাপাতালেও এমনকি এটি একটি সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনার এই সময়ে অক্সিজের প্রয়োজনীয়তা আসলে কতটা, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার এবং বর্তমানে হাসপাতালটির বার্ন ইউনিটে বিশেষ করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ইমরান মাহমুদের সঙ্গে আলাপে। তিনি বলেন, ‘কিছু কোভিড–১৯ রোগীর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা থাকে ভয়াবহ পর্যায়ের। তবে কমবেশি সব রোগীর ক্ষেত্রেই এ সমস্যা থাকে। তাই সবার জন্যই প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সক্ষমতা কম। এ কারণে সব রোগীর জন্য হাই ফ্লো অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের সরঞ্জাম থাকা জরুরি হলেও তেমনটা নেই। এই স্বল্প সক্ষমতা নিয়েই রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

ইমরান মাহমুদ বলেন, দেখা গেল কোনো একজন রোগী দিব্যি আছেন। অক্সিজেনের তেমন কোনো স্বল্পতাও নেই তাঁর। কিন্তু হঠাৎ করেই দেখা গেল ভীষণ রকম সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত অক্সিজেন সাপ্লাই দিতে হয়। সরঞ্জাম পর্যাপ্ত না হলে অন্য রোগীর কাছ থেকে নিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বাস্তবতা তৈরি হয়। একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য এ ধরনের মুহূর্ত খুবই কঠিন।

মূল সংকটটি এই মুহূর্তে সরঞ্জামের। ‘সংযোগ’ যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানেও এই সরঞ্জামস্বল্পতার বিষয়টিই সামনে আসছে। জুনের শুরুতে ‘আমাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার দিন, আমরা অক্সিজেন পৌঁছে দেব’ স্লোগানকে সামনে রেখে কাজ শুরু করলেও বিভিন্ন জায়গা থেকে এখন পর্যন্ত গ্রুপটির কাছে ১২টির মতো সিলিন্ডার এসে পৌঁছেছে। অথচ সংগৃহীত সিলিন্ডার বিনা মূল্যে রিফিল করে দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে লিন্ডে, আবুল খায়ের, ইসলাম, স্পেকট্রা অক্সিজেন প্রোডাকশন কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। একই ঘোষণা দিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম সার্কেল। একইভাবে আবুল খায়েরসহ কয়েকটি কোম্পানি নিজেরাই এখন এই স্লোগানকে আত্মস্থ করে নিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, করোনা সতর্কতা হিসেবে সিলিন্ডারগুলো স্যানিটাইজের সুবিধাও দিতে প্রস্তুত কেউ কেউ। কিন্তু এতসবেও কিছু হচ্ছে না। মূল সংকট অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের।

এ বিষয়ে আহমেদ জাভেদ বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বরাবরের মতোই এই দুর্যোগকে পুঁজি করেও ব্যবসা করছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহকারী বেশ কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্যানোলা, মাস্ক, রেগুলেটর, ভালভ ইত্যাদি অন্য সরঞ্জামেরও দাম বেড়েছে। কেউ কল্পনাও করেনি যে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম ২৬ হাজার টাকা হতে পারে। অথচ এখন বাস্তবতা এমনই। এ অবস্থায় আমরা “সংযোগ”–এর মাধ্যমে এ সংকট নিরসনের চেষ্টা করছি। আমরা সংগৃহীত সিলিন্ডারগুলো দিয়ে মুখ্যত বিভিন্ন হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ করব বিনা মূল্যে।’

ঘরে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা হবে, তা জানতে চাইলে “সংযোগ”–এর পক্ষ থেকে জাননো হয়, বাসায় কোনো কোভিড–১৯ রোগী থাকলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র প্রদর্শনপূর্বক তাঁকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় একটি সার্ভিস চার্জ ধরা হবে। অক্সিজেন ও সিলিন্ডার সংগ্রহ, সিলিন্ডার স্যানিটাইজ করা, পরিবহন ইত্যাদি ক্ষেত্রে হওয়া ব্যয় সামাল দিতেই এই সার্ভিস চার্জের বিষয়টি সামনে এসেছে। আর এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁদেরই নিযুক্ত করা হবে, যাঁরা এই করোনার সময়ে কাজ হারিয়ে উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন। তাই সার্ভিস চার্জ হিসেবে যে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধরা হবে, তা মূলত এ কর্মীবাহিনীর বেতন–ভাতাতেই ব্যয় হবে। দরিদ্র কারও কাছ থেকে অবশ্য সার্ভিস চার্জ নেওয়া হবে না।

এ মুহূর্তে ভীষণ জরুরি এ উদ্যোগ নেওয়ার পরও এখনো জোরালো সাড়া পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে আহমেদ জাভেদ বলেন, দেশে অনেক কমপ্লায়েন্স কারখানা এখন বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চলছে। এসব কারখানার সঙ্গে যুক্ত মেডিকেল সেন্টারে কমপক্ষে তিন থেকে চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকে। এসব কারখানার প্রতিটি থেকে অন্তত একটি করে সিলিন্ডার পেলেও এ সংকট অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব। আবার অনেকের কাছে ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেক খালি সিলিন্ডার পড়ে আছে। এগুলো হাতে পেলে সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। এতে বাজারে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দামও যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসবে। আবার দরিদ্র সাধারণ মানুষকেও সেবাটি দেওয়া যাবে।

পিপিইসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সরঞ্জাম একজনের কাছ থেকে অন্যজনের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করছে সংযোগ। সুন্দরবনের কাছে বানিয়াশান্তায় ১০০ পরিবারের মধ্যে এক মাসের খাবার বিতরণ কিংবা খুলনা জুটমিলের শ্রমিকদের মধ্যে এক মাসের খাবার বিতরণের মতো কাজও তারা করছে। এরই সাম্প্রতিক সংযোজন বলা যায় এই অক্সিজেন সরবরাহ কার্যক্রমকে। একই সময়ে গ্রুপটি করোনাকালে বিপদগ্রস্ত বিভিন্ন পেশাজীবীকে রক্ষায় একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ‘সংযোগ: কানেক্টিং পিপল’ গ্রুপটি। লোকজ উৎসব ও মেলার মৌসুমের ঠিক আগে আগে করোনার সংক্রমণ ও সেই কারণে সব বন্ধ করে দিতে বাধ্য হওয়ায় এবার ভীষণভাবে বিপাকে পড়েছেন কারু, চারু, মৃৎ, দারুশিল্পীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী।

এই পেশাজীবীদের রক্ষায় শুরু করা কাজে এরই মধ্যে বেশ ভালো সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানালেন আহমেদ জাভেদ। একই সঙ্গে জানালেন, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি উদ্যোগ হলেও এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এখন যুক্ত হচ্ছেন। চিকিৎসক বন্ধুরাসহ নানা পেশাজীবী এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন