বাংলাদেশি শিক্ষকের সানারিজে যুক্তরাষ্ট্রের ১০৪ শিক্ষার্থীর সাফল্য উদ্যাপন
কারও গলায় মেডেল, কারও হাতে সম্মাননা স্মারক। মঞ্চে উঠছে একের পর এক শিশু-কিশোর। নিচে অভিভাবকদের উচ্ছ্বাস, করতালি আর ক্যামেরার ঝলকানি। কারও মুখে সাফল্যের হাসি, কারও চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আবার কখনো মঞ্চ ভরে যাচ্ছে গান, নৃত্য আর ট্যালেন্ট শোতে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশি শিক্ষক আবু হানিফ জুয়েলের প্রতিষ্ঠিত সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টারের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানটি যেন হয়ে উঠেছিল শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদ্যাপনের এক বড় উৎসব। লস অ্যাঞ্জেলেসের বুরব্যাংকের সায়েন্টোলজি অডিটোরিয়ামে ৮ আগস্ট রাতে হয় এই অনুষ্ঠান। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার অনুষ্ঠানেও একঘেয়েমি ছিল না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অ্যাওয়ার্ড বিতরণ, গান, নৃত্য ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশনায় মুখর ছিল পুরো আয়োজন।
বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ১০৪ জন শিক্ষার্থীকে নানা ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা দেওয়া হয়। এলিমেন্টারি স্কুল থেকে টুয়েলভ গ্রেডের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, ইউসিএলএসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও অভিনন্দন জানানো হয়।
মঞ্চে একের পর এক সাফল্যের গল্প
অ্যাওয়ার্ডের তালিকাটিও ছিল বৈচিত্র্যময়। কারও স্বীকৃতি একাডেমিক মেধার জন্য, কারও নেতৃত্বের জন্য, আবার কারও উন্নতি কিংবা বিশেষ অবদানের জন্য।
মোস্ট ইন্সপায়ারিং/ইনফ্লুয়েনশিয়াল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান তাজ খান (জিম)। লিডার অ্যাওয়ার্ড পান মেহরান আলম। লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান গ্রিসেলদা ভাসকেজ। আইভি/এলিট স্কুলস অ্যাডমিটস অ্যাওয়ার্ড পান তানভির। বেস্ট মেমোর অ্যাওয়ার্ড পান শেখ জিবরান (জিবু)।
টপ স্কলার অ্যাওয়ার্ড পান ড. সুলিন চৌধুরী। মোস্ট ইমপ্রুভড স্টুডেন্ট অব অল টাইম অ্যাওয়ার্ড পান সাকিবা। মোস্ট লাইকলি টু সাকসিড—ক্লাস অব ২০২৬ অ্যাওয়ার্ড পান আনিয়া এবং ম্যাথ মাস্টারি অ্যাওয়ার্ড পান আইমান।
এর বাইরে এলিমেন্টারি থেকে টুয়েলভ গ্রেডের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১০৪ শিক্ষার্থী পান স্বীকৃতি।
একজনের পর একজন যখন মঞ্চে উঠে মেডেল ও পুরস্কার নিচ্ছিলেন, তখন মিলনায়তনজুড়ে ছিল অভিভাবকদের করতালি। সন্তানদের সাফল্যের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত ছিলেন অনেক মা–বাবা।
সাফল্যের পরের গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়
সানারিজের অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের সাফল্য নয়, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অর্জনও গুরুত্ব পেয়েছে। হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, ইউসিএলএসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানানো হয়। তাঁদের সাফল্যের গল্প বর্তমান শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়—যেন আজকের ছোট্ট শিক্ষার্থীও আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নিজের জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে।
এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে টুয়েলভ গ্রেডের শিক্ষার্থী—সবাইকে তাঁদের নিজ নিজ পর্যায়ের অর্জনের জন্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সাফল্য ভাগ করে নেওয়ার উপলক্ষ।
পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর ১৫ বছরের গল্প
সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টারের এই ১৫ বছরের পথচলার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ একটি গল্প।
২০১১ সালে প্রয়াত সেলিম চৌধুরীর সহযোগিতায় লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল বাংলাদেশ এলাকায় একটি টিউটোরিয়াল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন আবু হানিফ জুয়েল। প্রথমে এর নাম ছিল সেফালন টিউটোরিয়াল সেন্টার। ২০১৩ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টার।
গত ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন। তাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি। তবে সানারিজের শিক্ষার্থীদের পরিচয় শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সীমাবদ্ধ নয়। কোরিয়ান, চীনা, ফিলিপিনো, ভারতীয়, পাকিস্তানি, ইথিওপীয়, মঙ্গোলীয়, লাতিনোসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়েছেন।
শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের সাফল্যই এবারের ১৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রয়াত সেলিম চৌধুরীকে স্মরণ
১৫ বছর পূর্তির এ আয়োজনে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় প্রয়াত সেলিম চৌধুরীকে।
আবু হানিফ জুয়েলের পথচলার শুরুর দিকে সেলিম চৌধুরীর সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেলিম চৌধুরীর স্ত্রী সালমা চৌধুরী। তাঁকেও ধন্যবাদ জানানো হয়।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতার জন্য টিপু আলম ও জেবুন আলমের পরিবারকে ধন্যবাদ জানান জুয়েল।
কমিউনিটি লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পান খান মোহাম্মদ আলী
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। কমিউনিটি লিডারশিপ অনার অ্যাওয়ার্ড পান লস অ্যাঞ্জেলেসপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘আনন্দ মেলা’র উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা খান মোহাম্মদ আলী। বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও কমিউনিটিকে একত্র করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
পুরস্কার গ্রহণের পর খান মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশিদের পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানান। সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টার ও আবু হানিফ জুয়েলের প্রতিও তিনি ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে সমাজসেবী নাসির খান শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে ‘নাসির খান স্কলারশিপ’ চালুর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
মেধাবী ও উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলায় সহযোগিতা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি এবং বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন আয়োজকেরা।
পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নৃত্য ও ট্যালেন্ট শো
সানারিজের ১৫ বছর পূর্তির আয়োজন শুধু অ্যাওয়ার্ড বিতরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা তুলে ধরতে ছিল গান, নৃত্য ও ট্যালেন্ট শো।
বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা মঞ্চে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরে। শিশুদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নৃত্য থেকে শুরু করে আধুনিক পরিবেশনা—মঞ্চে ছিল নানা রঙের বৈচিত্র্য।
দীর্ঘ অনুষ্ঠানজুড়ে একের পর এক পরিবেশনা দর্শকদের ধরে রাখে। শেষদিকে মাইকেল জ্যাকসনের গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পর্বের সমাপ্তি হয়।
এক মঞ্চে শিক্ষার্থী, পরিবার ও কমিউনিটি
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক বহুজাতিক মিলনমেলায়।
সন্তানের হাতে পুরস্কার ওঠার মুহূর্তে অভিভাবকদের চোখে ছিল গর্ব। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী ও কমিউনিটির মানুষের অংশগ্রহণে ১৫ বছর পূর্তির আয়োজনটি হয়ে ওঠে আনন্দঘন এক মিলনমেলা।
শেষদিকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অতিথিরা মঞ্চে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। কারও গলায় মেডেল, কারও হাতে অ্যাওয়ার্ড—মুখে সাফল্যের হাসি। ১৫ বছরের পথচলার সেই ছবি যেন হয়ে থাকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্জনের প্রতীক।