প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সম্পর্কে অগ্রাধিকার
চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ অন্তত ১৫টি দলিল সইয়ের প্রস্তুতি।
চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ জিডিআইয়ে যুক্ততা।
বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে সমঝোতা স্মারক।
আলোচনা হবে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম চীন সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসছেন। দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এবার দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। ঢাকা ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে এমন ধারণা দিয়েছেন।
ঢাকার কর্মকর্তারা আশা করছেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া ঘুরে এখন চীনে রয়েছেন তারেক রহমান। এ চীন সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আগ্রহ রয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে চীনকে নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপট এ সফর ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের সফরে চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ ১৫ থেকে ১৭টি দলিল সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার কূটনীতিকেরা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর অন্যান্য শীর্ষ নেতার সফরের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। অতীতের সফরগুলোয় আর্থিক সহায়তা, প্রকল্পে অর্থায়ন, চুক্তি ও সমঝোতায় জোর থাকত। এবার দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকার কর্মকর্তারা আশা করছেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
বেইজিংয়ে ব্যস্ত দিন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ে আজ দিনের শুরুতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। তিনি চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।
পরে চীনের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চেরি গ্রুপ, হানদা গ্রুপ ও চায়নাট্যাক্স করপোরেশনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করবেন। এদিন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান লিউ হাইসিং, চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (সিডকা) চেয়ারম্যান চেন শিয়াওডং ও এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার (চায়না এক্সিম ব্যাংক) চেয়ারম্যান চেন হুয়াইউ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বিডা আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আর চীনের শীর্ষ তিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশের নানা খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে অগ্রগতি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিডকা ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট প্রকল্প এবং বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তার বিষয়ে চীনের দুই অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বিডা আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আর চীনের শীর্ষ তিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশের নানা খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে অগ্রগতি হতে পারে।
দুই শীর্ষ নেতার বৈঠক
আজ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী ঘণ্টাখানেক আলোচনা করবেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বেইজিংয়ে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকে মূলত বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। দুই পক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে। আলোচনায় বহুল আলোচিত তিস্তা বৃহদায়তন প্রকল্প, চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ জিডিআইয়ে বাংলাদেশের যুক্ততার বিষয়গুলো আসবে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের পাশাপাশি ভূরাজনীতি ও ভূকৌশলগত বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে আগামীকাল শুক্রবার অনুষ্ঠেয় বৈঠকে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে সইয়ের জন্য চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ ১৫টির বেশি দলিল তালিকায় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে রূপরেখা এবং চীনা ভাষায় শিক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি। সমঝোতা স্মারকের তালিকায় আছে বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে সহযোগিতা, জিডিআই বাস্তবায়নের বিকাশ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, কারিগরি শিক্ষা, চায়না মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে পৃথকভাবে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে বাসস ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা।
বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল সই হবে। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে দেওয়া চীনের প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে যোগ দেবেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে সইয়ের জন্য চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ ১৫টির বেশি দলিল তালিকায় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে রূপরেখা এবং চীনা ভাষায় শিক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি।
দালিয়ানের কর্মসূচি
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানসহ অন্য সফরসঙ্গীদের নিয়ে দালিয়ান থেকে বেইজিং পৌঁছান। তিনি এদিন দালিয়ান শহর থেকে বুলেট ট্রেনে চড়ে চীনের রাজধানীতে পৌঁছান।
বেইজিংয়ের চাউমিং রেলস্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমসমন্ত্রী সান মেইজুন। রেলস্টেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
এর আগে গতকাল সকালে দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’–এর কর্ম–অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সমঝোতা স্মারকের তালিকায় আছে বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে সহযোগিতা, জিডিআই বাস্তবায়নের বিকাশ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, কারিগরি শিক্ষা, চায়না মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে পৃথকভাবে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে বাসস ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজাখস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে একমত হন। দুই প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ জনশক্তি পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
বেইজিংয়ে শুক্রবারের কর্মসূচি
আগামীকাল তিয়েনআনমেন স্কয়ারে মনুমেন্ট অব দ্য পিপলস হিরোজে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফরের শেষ দিনের কর্মসূচি শুরু করবেন। পরে গ্রেট হল অব পিপলে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজি। এরপর তিনি বৈঠক করবেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে। ওই বৈঠক শেষে তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। ওই দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বেইজিং থেকে ঢাকার পথে যাত্রা করবেন।
চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
এক দশক পর নতুন উত্তরণ
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈশ্বিক পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম জিডিআই বা বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি এক দশক পর সম্পর্কে নতুন উত্তরণ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সবশেষ ২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়েছিল।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারে সফরে দুই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা স্মারক এবং জিডিআইয়ে বাংলাদেশের যুক্ততা নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই সম্পর্কের উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ।
জানতে চাইলে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জিডিআইতে যোগ দিচ্ছে বলে শুনছি। এটি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের স্তরে নতুন মাত্রা যোগ করবে। দ্বিপক্ষীয় অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃতি লাভ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর বড় পরিসরে বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করা যায়।’