ভিন্নমত গ্রহণ করতে না পারা দেশের বড় সংকট

বাঁ থেকে এম হুমায়ুন কবির, অধ্যাপক রওনক জাহান ও সেলিমা রহমান

ভিন্নমতকে অগ্রাহ্য বা অবৈধ প্রমাণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা বাংলাদেশের জন্য বড় সংকট বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক—এ কথা স্বীকার না করলে সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে না। কারও মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।

‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গঠন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক রওনক জাহান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)।

আলোচনায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, মতের অমিল হলেই এক পক্ষকে ‘অপর’ বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেশে ক্রমেই বাড়ছে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে না এলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সহাবস্থান সম্ভব নয়।

সমাজে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, আগে ভয় ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ঘিরে। এখন সেই ভয় অনির্দিষ্ট—কোথা থেকে আসবে, কে আক্রমণ করবে, কে হুমকি দেবে—এ নিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে না, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বাধা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, নির্বাচনের সময় ভিন্ন আদর্শ ও নীতির প্রতিযোগিতাই স্বাভাবিক। সব দল একই মতের হলে নির্বাচনেরই প্রয়োজন পড়ে না। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ভিন্নমতকে গণতান্ত্রিক পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনসংক্রান্ত সমস্যাগুলো শুধু ১৬ বছরের নয়, এগুলোর শিকড় অনেক পুরোনো। সমস্যার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা না বুঝলে সমাধান পাওয়া যাবে না। আসন্ন নির্বাচন নিখুঁত হবে, এমন প্রত্যাশা কারও নেই। তবে সাধারণ মানুষ বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন চায়।

ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি দেশে দুর্বল

অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের সংজ্ঞা কী, তা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি দেশে দুর্বল; যারা পরাজিত হয়, তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পথেই হাঁটে, এটাই দীর্ঘ দিনের চর্চা।

অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রধান উদ্বেগ নিরাপত্তা। অথচ তরুণদের আলোচনায় এই বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না, যা বিস্ময়কর।

প্রজন্মগত বিভাজন প্রসঙ্গে রওনক জাহান বলেন, তরুণেরা প্রায়ই বলেন, বয়স্করা তাঁদের কথা বোঝেন না। কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রজন্মই স্বপ্ন দেখেছে এবং সংগ্রাম করেছে। আগের প্রজন্মের অভিজ্ঞতা অস্বীকার না করে পারস্পরিক সংলাপ বাড়ানো জরুরি। দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য স্বল্পমেয়াদি সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথেও হাঁটতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল কমিশন বা নীতিমালার আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; রাজনৈতিক দলের আচরণে পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আগে ভয় ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ঘিরে। এখন সেই ভয় অনির্দিষ্ট, কোথা থেকে আসবে, কে আক্রমণ করবে, কে হুমকি দেবে—এ নিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
অধ্যাপক রওনক জাহান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

প্রজন্মগত পরিবর্তন

আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ও সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একযোগে তিনটি বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—প্রজন্মগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। এই রূপান্তরগুলোই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করছে।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, দেশে একটি নতুন প্রজন্মের উত্থান ঘটছে, যারা আগামী দিনে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রভাব বিস্তার করবে। এটি একটি প্রজন্মগত পরিবর্তন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে এমন বার্তা উঠে আসছে যে ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। ফলে দেশে একটি রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটছে। এ সময় মানুষের মধ্যে ভিন্ন ধরনের রাজনীতির প্রত্যাশাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

অনুষ্ঠানে সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, ‘বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু সফল সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্ন নয়; বরং...বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এটি চতুর্থ প্রচেষ্টা।’

ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, নির্বাচন শুধু পদ্ধতি বা ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত হয় না; নির্বাচন গড়ে ওঠে আস্থার ওপর। যখন রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংঘাতের বদলে সংলাপ বেছে নেয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে গোষ্ঠীগুলো শান্তির দায়িত্ব নেয়, তখন সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

‘এবার আমাদের খাওয়ার পালা’

আলোচনায় অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যে ‘এবার আমাদের খাওয়ার পালা’ এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। এই মানসিকতা নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। এর পাশাপাশি হাজার হাজার নেতা-কর্মীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।

সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যেও নির্বাচন অপরিহার্য উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, দেশ এখন একটি সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক সরকারের মুখাপেক্ষী। রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়নসহ নানা সংস্কার কার্যকর করতে হলে নির্বাচিত সরকারের বিকল্প নেই।

দেশে একটি নতুন প্রজন্মের উত্থান ঘটছে, যারা আগামী দিনে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রভাব বিস্তার করবে।
এম হুমায়ুন কবির, সাবেক কূটনীতিক

সংশয় ও অনিশ্চয়তা

গোলটেবিল আলোচনায় ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের যাত্রায় বাংলাদেশ: মাঠপর্যায়ের চিত্র’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বিইআই। এই প্রতিবেদন তৈরির কাজে যশোর, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ—এই পাঁচটি বড় শহরের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী, তরুণ, নারী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং গণমাধ্যমের কর্মীসহ মোট ২৫০ জনের মতামত নেওয়া হয়। গবেষণার জন্য মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছিল গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ আছে। এর পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বহুল আকাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে কি না, সে বিষয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। উগ্র বয়ানগুলো আতঙ্কিত করছে, এমন মতামতও উঠে এসেছে গবেষণায়।

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যে এবার আমাদের খাওয়ার পালা—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। এই মানসিকতা নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।
সেলিমা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য

গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ভোটাররা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করছেন। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিইআইয়ের সহকারী পরিচালক নিপা রানী।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার, এবি পার্টির নারী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফারাহ নাজ সাত্তার, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফয়সাল মাহমুদ, নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ারসহ আরও অনেকে।