ঈদের পরের দীর্ঘ ছুটির আলস্য লেগে আছে রাজধানীর নাগরিক জীবনে। ব্যস্ততার তাড়াবিহীন মন্থর বিকেলে আজ শুক্রবার বিকেলে এক মনোজ্ঞ আয়োজন হলো মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সহায়তা নিয়ে। আগের দিন বৃহস্পতিবার ছিল মহান স্বাধীনতা দিবস। তার রেশ নিয়ে আলোচনা, প্রদর্শনী, সংগীত, স্মৃতি আর ইতিহাসের প্রেরণায় উজ্জীবিত আয়োজনটি হলো ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে।
প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বই ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত: মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু’ শীর্ষক বইটি অবলম্বন করে বিস্তৃত হয়েছিল আলোচনার পরিধি। কমবেশি সবারই জানা যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানবতাবাদী প্রগতিশীল লেখক-শিল্পীরা অনেক রকমের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি, তহবিল সংগ্রহের কাজে। তাঁদের এই বহুমাত্রিক সহায়তা মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিদেশি বন্ধুদের এই সহায়তার কিছু কথা অনেকের জানা, আবার অনেক কথাই অজানা। মতিউর রহমান দীর্ঘদিন অনুসন্ধান করে বিদেশি লেখক-শিল্পীদের সহায়তার নানা ধরনের উদ্যোগগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। এসব নিয়েই ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়েছে বইটি।
আলাপে বিস্তারে
‘আলাপে বিস্তারে’ নামে বেঙ্গল বই আয়োজিত এ আয়োজন শুরু হয়েছিল মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। খান মোহাম্মদ ফারাবী অনূদিত কবিতাটি আবৃত্তি করেন তাহসিন রেজা।
মতিউর রহমান বলেন, ষাটের দশক থেকেই সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দেশের লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি মুনীর চৌধুরী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদসহ দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী লেখক, শিল্পী ও শিক্ষাবিদদের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এই মানুষদের অবদানের কথা আমরা কখনো ভুলতে পারি না। প্রথম আলো মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থানে ছিল, সেই অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
বইটির আটটি অধ্যায়ে বিদেশি লেখক-শিল্পীদের ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা, ছবি ও অনেক তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। এসবের নেপথ্য কাহিনি গল্পের মতো করে বলে গেছেন মতিউর রহমান। সেই গল্পে যেমন তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ-আগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে বিশ্বজোড়া বিপুল আলোড়ন তোলা পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে নিউইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কাহিনি। আরও দুটি কনসার্ট হয়েছিল ক্রিকেটের জন্য বিখ্যাত ওভাল স্টেডিয়ামে ‘গুডবাই সামার’ ও লন্ডনে ‘কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি ১৯৭১’ নামে। আরও বলেছেন কলকাতা, মুম্বাইয়ের শিল্পীদের অবদান, আর্জেন্টিনায় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর উদ্যোগ, জোয়ান বায়েজের বিখ্যাত গান ‘সং অব বাংলাদেশ’, অ্যালেন গিন্সবার্গ ও রুশ কবি আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির কবিতা পাঠের আয়োজনের গল্প।
শ্রোতাদের ইতিহাসের এক দীর্ঘ যাত্রার ভেতর দিয়ে নিয়ে গেছেন মতিউর রহমান। বলেছেন, ‘মার্চের এই দিনগুলোতে আমরা ৫৫ বছর আগের উত্তাল দিনগুলোতে ফিরে যাই।’ স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চ কারফিউ জারি করা হয়েছিল। কারফিউ শিথিল হলে তিনি ২৭ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, শহীদুল্লাহ হল, জগন্নাথ হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার শিকার লাশের সারি দেখেন।
মতিউর রহমান বলেন, ষাটের দশক থেকেই সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দেশের লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি মুনীর চৌধুরী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদসহ দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী লেখক, শিল্পী ও শিক্ষাবিদদের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এই মানুষদের অবদানের কথা আমরা কখনো ভুলতে পারি না। প্রথম আলো মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থানে ছিল, সেই অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
বইটি হাতে পেয়ে একটানা পড়েছেন উল্লেখ করে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, লেখকের আগ্রহ, অতি খুঁটিনাটি তথ্যের প্রতিও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, পর্যবেক্ষণ ও পরিশ্রম লক্ষ করে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও প্রাবন্ধিক মফিদুল হক তাঁর আলোচনায় বলেন, ষাটের দশকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যে প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশেষ উচ্চতা লাভ করেছিল। একটা বিশেষ অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল।
মফিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনেক বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এমন অপচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবমূল্যায়িত হবে না। সে কারণেই ইতিহাসের অনুসন্ধান জরুরি।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘অন্য অনেক জাতির মতো সভ্যতার উত্তরাধিকার আমরা স্বাভাবিকভাবে পাইনি। আমাদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তা অর্জন করতে হয়েছে। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের নিবিড়ভাবে চর্চা করে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, এই বইটি নিবিড় অনুসন্ধান, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের একটি নিদর্শন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে প্রথাগত কোনো সভাপতি ছিলেন না। তবে সভাপতির মতোই সমাপনী বক্তব্য দিয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। তিনি বলেন, বইটি পড়ে তিনি অভিভূত। এই বইটি সঠিক অর্থে সাহিত্যিক গ্রন্থ নয়। সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে অনুসন্ধিৎসুভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তা সহজ-সরল করে সব রকমের পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
বইটি হাতে পেয়ে একটানা পড়েছেন উল্লেখ করে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, লেখকের আগ্রহ, অতি খুঁটিনাটি তথ্যের প্রতিও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, পর্যবেক্ষণ ও পরিশ্রম লক্ষ করে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের ভেতরেও লেখক-শিল্পীরা ভূমিকা রেখেছেন। ‘বিক্ষুব্ধ লেখক সমাজ’ নামে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে লেখক ও ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ নামে শিল্পীরা দেশের ভেতরে থেকেই কাজ করেছেন। তিনি এই বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের এমন অনেক বিষয়ই এখনো যথেষ্ট আলোচনায় আসেনি। তিনি এসব বিষয় নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠান শেষ হয় শিল্পী ওয়ার্দা আশরাফের গাওয়া কনসার্ট ফর বাংলাদেশের পণ্ডিত রবিশঙ্করের গান ‘ও ভগবান খোদাতায়ালা’, জোয়ান বায়েজের গান ‘বাংলাদেশ’ এবং জর্জ হ্যারিসনের গান ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ পরিবেশনা দিয়ে। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল।
ছবিতে, নিদর্শনে
মিলনায়তনের সামনে ছিল প্রদর্শনীর আয়োজন। সেখানে সুদৃশ্য টেবিল ও ডিসপ্লে বোর্ডে ছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ভিনাইল রেকর্ড, প্রামাণ্যচিত্র, জর্জ হ্যারিসনের আত্মজীবনী, তাঁর স্ত্রী অলিভিয়া হ্যারিসনের স্বাক্ষর করা ভিনাইল রেকর্ড, জোয়ান বায়েজের ‘সং অব বাংলাদেশ’-এর লংপ্লেসহ বিভিন্ন সময় প্রকাশিত রেকর্ড, তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি ১৯৭১ উপলক্ষে প্রকাশিত পুস্তিকা ও বিভিন্ন ছবি, গুডবাই সামার কনসার্টের ছবি, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কিসহ বিভিন্ন কবি-লেখকের ছবি। কলকাতা ও মুম্বাইয়ের শিল্পীদের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অনুষ্ঠানের ছবিসহ বিভিন্ন নিদর্শন।