নির্বাচিত-অনির্বাচিত সব সরকারের সময়ই আমরা একই ধারা দেখে আসছি—শিক্ষকদের একটি অংশ নানা ধরনের দলাদলিতে যুক্ত হয়েছেন। এই প্রবণতা আগে থেকেই চলে আসছে এবং এখনো অব্যাহত আছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার ওপর।
কিন্তু এর দায়দায়িত্ব কার? শিক্ষকদের নিশ্চয়ই দায়িত্ব আছে। শিক্ষক সংগঠনগুলোরও দায় আছে। তবে আমি বলব, তার চেয়েও বেশি দায়িত্ব আমাদের রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক সংস্কৃতির এবং সরকারের। কারণ, তাঁরা এটিকে উৎসাহিত করছেন বা মেনে নিচ্ছেন। বিশেষ করে সরকারি দল যদি শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াকে সমর্থন বা উৎসাহ না দিত এবং কার্যকরভাবে বলত যে তারা শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া চায় না, তাহলে পরিস্থিতি হয়তো এমন হতো না। কেউ কেউ হয়তো এ কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হয়ে উঠেছে একধরনের দলীয় আনুগত্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা বা অন্যান্য যোগ্যতা যেন গৌণ। তিনি আনুগত্য দেখাতে পারবেন কি না, সেটিই যেন প্রধান বিবেচনার বিষয়।
আমরা মনে করেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেবে না; কিন্তু সেখানেও ধরাধরি, আনুগত্য ও পরিচিতির মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে, যেগুলো শিক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এর ফলে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এখনো একধরনের অব্যবস্থাপনা দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না।
আমি বলব, এ ক্ষেত্রে সরকার ও রাজনীতিকদের দায়িত্ব বেশি। শিক্ষক সংগঠনগুলোর কথাও যদি ধরি, সেখানেও দলীয় ভিত্তিতে সংগঠন তৈরি হচ্ছে। প্রতিনিধিত্বশীল শিক্ষক সংগঠন তৈরির কোনো নিয়মনীতি চালু হয়নি। রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে সংগঠনগুলো চলছে এবং এভাবে নিজেদের প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করছে। এতে শিক্ষকদের মানমর্যাদা ও স্বার্থ যেমন ঠিকমতো রক্ষা হয় না, তেমনি শিক্ষার স্বার্থও রক্ষিত হয় না। শিক্ষার্থীদের স্বার্থও রক্ষিত হয় না।
এখানেও সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আছে। তাদের বলতে হবে, আমরা শিক্ষাকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখব। শিক্ষাকে দলীয় রাজনীতি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকদের সংগঠনগুলোও যেন সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব সংগঠন হবে পেশাগত সংগঠন, যারা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পেশা ও শিক্ষার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে।
এখন এত সংগঠন, কিন্তু কে কার স্বার্থ রক্ষা করে, তা জানি না। কোনো সুফলও পাচ্ছি না। বরং দলাদলি বাড়ছে এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। এখান থেকে বের হওয়ার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংকল্প। শিক্ষক ও শিক্ষক সংগঠনগুলোরও আলোচনায় আসা উচিত। দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে শিক্ষকদের মানমর্যাদা, শিক্ষার স্বার্থ এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণ—এই বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
মনজুর আহমদ: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়