দেশে এলপিজি আমদানি কমেছে দেড় লাখ টন, দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তা
দেশে প্রতিবছর ১০ শতাংশের বেশি হারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ে। তাই বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হয়। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার টন।
আর আগের বছরের তুলনায় গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি কমার হার ছিল বেশি। এতে এলপিজির বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
গত তিন বছরে দেশে এলপিজি আমদানির এমন চিত্র দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ২০২৩ সালে এলপিজি আমদানি হয় ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। আর গত বছর আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। আমদানি বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো ১০ শতাংশ কমেছে। এতে বছর শেষে যেটুকু মজুত থাকার কথা, তা–ও বাজারে বিক্রি করা হয়ে গেছে। এরপরও বাজারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তা।
বিইআরসি বলছে, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছে ৫২টি কোম্পানি। এর মধ্যে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরতে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে। আমদানি করার সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত বছর কোনো না কোনো মাসে আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি। আর প্রতি মাসে আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বছরের শুরুতে আমদানি করলেও শেষ দিকে কেউ কেউ আমদানি বন্ধ রাখে।
বিইআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজির এ সংকট আরও আগেই বুঝতে পারার কথা ছিল। প্রতি মাসে আমদানি কমার এসব তথ্য সরকারের কাছে আছে। তাই যারা নিয়মিত আমদানি করে, তাদের আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। যথাসময়ে অনুমতি দিলে বর্তমানের এ সংকট তৈরি হতো না।
বিইআরসি বলছে, এলপিজি আমদানি বাড়াতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। ঋণপত্র (এলসি) খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমদানির অনুমতি বাড়িয়ে দিয়েছে বিইআরসি। ব্যবসায়ীরা আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। আমদানি বাড়লে সরবরাহ-সংকট কমে আসবে।
২০২৪ সালে আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। আর গত বছর আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। আমদানি বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো ১০ শতাংশ কমেছে। এতে বছর শেষে যেটুকু মজুত থাকার কথা, তা–ও বাজারে বিক্রি করা হয়ে গেছে। এরপরও বাজারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তা।
বর্তমানে এলপিজির যে সংকট, তা সরবরাহজনিত সংকট বলে করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। এলপিজির বাজার নিয়ে গত বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৭০টি জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। ডিসেম্বরে আরও ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। চীনের মতো বড় ক্রেতারাও এখন বৈশ্বিক এলপিজি বাজার থেকে কিনছে। তাই এলপিজি কেনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তবে চলমান এলপিজিপর সংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করেন এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক। একই গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, লোয়াবের পাঁচ সদস্য কোম্পানি এক বছর আগে আমদানি বাড়াতে অনুমোদন চেয়েছিল। এক বছর পর চিঠির জবাবে মন্ত্রণালয় বলেছে, এটা নীতিমালা অনুমোদন করে না। এরপর আবার চিঠি দেওয়া হয়েছে গত আগস্টে। নতুন প্ল্যান্টের অনুমোদন চাইলেও দেয়নি।
কয়েক দোকান খোঁজ নিয়ে একটি সিলিন্ডার পেয়েছেন। দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও দিতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা।মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না আখতার
বাড়তি দামে এলপিজি, পাওয়া যাচ্ছে না সিলিন্ডার
দুই সপ্তাহ পরও ঢাকায় এলপিজির সংকট কাটেনি। গ্যাস না পেয়ে অনেকেই বিদ্যুৎ–চালিত চুলা কিনে রান্না করছেন। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না আখতার বলেন, কয়েক দোকান খোঁজ নিয়ে একটি সিলিন্ডার পেয়েছেন। দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও দিতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা।
দোকানিদের ভাষ্য, পরিবেশকেরা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দিচ্ছে না। কোথাও দিনে যে কটি সিলিন্ডার আসে, তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এখনো ৭০ শতাংশ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে। শিগগিরই সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে।
চট্টগ্রামে কোথাও কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া গেলে বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। আগ্রাবাদের বাসিন্দা আরফাতুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার টাকায়। তবে বেশির ভাগ এলাকায় সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। দোকানিদের ভাষ্য, পরিবেশকেরা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দিচ্ছে না। কোথাও দিনে যে কটি সিলিন্ডার আসে, তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম শহরের আসকারদিঘীর পূর্ব পাড় এলাকার হোসাইন মঞ্জিলের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, তাঁদের ভবনে ২৪টি ফ্ল্যাট। লাইনের গ্যাস নেই, সবার ভরসা এলপিজি। প্রতিদিন তিন থেকে চারটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। এখন বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
দুই নম্বর গেট এলাকার মেসার্স মোহাম্মদীয়া ট্রেডিংয়ের কর্ণধার মুহাম্মদ আলী আজম বলেন, প্রতিদিন গড়ে ২০০ ক্রেতা তাঁর দোকানে আসেন। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসছে। গত এক সপ্তাহে মাত্র ১৫টি সিলিন্ডার পেয়েছেন।
রাজশাহী শহরের সাধুর মোড় এলাকার খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী গ্যাস সার্ভিসের মালিক ইমরান আলী গত বৃহস্পতিবার বলেন, ভ্যানে করে খালি সিলিন্ডার নিয়ে বিভিন্ন পরিবেশকের দোকানে ঘুরেছেন। একটি সিলিন্ডারও পাননি।
সীমিত আকারে পাওয়া গেলেও সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে বরিশালে। শহরের নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. আল আমিন বলেন, ১ হাজার ৩০৬ টাকার গ্যাস সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজ অ্যাভিনিউ এলাকার খুচরা দোকানদার মনির হোসেন বলেন, ১ হাজার ৪০০ টাকায় কিনে ১ হাজার ৫৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এক মাস ধরে অনেক কোম্পানির সরবরাহ নেই।
রাজশাহী শহরের সাধুর মোড় এলাকার খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী গ্যাস সার্ভিসের মালিক ইমরান আলী গত বৃহস্পতিবার বলেন, ভ্যানে করে খালি সিলিন্ডার নিয়ে বিভিন্ন পরিবেশকের দোকানে ঘুরেছেন। একটি সিলিন্ডারও পাননি।
রাজশাহী শহরের রামচন্দ্রপুর এলাকার মোহন আলী নতুন কেরোসিনের চুলা কিনেছেন। তিনি বলেন, গ্যাস না থাকার কারণে কেরোসিন চুলাই এখন তাঁর ভরসা। রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া শাহরিন বলেন, বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ–চালিত চুলা কিনেছেন।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা)