পাঠকের লেখা
একটি সৎ পরামর্শ ও একটু সহানুভূতি
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম ১৯৮৩ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডে উপজেলা হিসাবরক্ষক পদে। কর্মস্থল ছিল রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলা। তখন উপজেলাটি গঠিত হয়েছে কেবল। এটি ছিল দুর্গম পার্বত্য জনপদ। জনবসতি ছিল ১০ থেকে ১২ হাজার।
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, বিআরডিবি নামে এটি বেশি পরিচিত। রাজস্থলীতে একটি সেমিপাকা ভবনে এর দপ্তর, ওপরে টিনের ছাউনি। সরকারি যে কোয়ার্টারটি ছিল, তাতে থাকার ঘর ছিল তিন-চারখানা। সেগুলোরও একই কাঠামো।
আমি চট্টগ্রাম শহরের ছেলে। বাড়ি আমাদের চেরাগী পাহাড়ের পাশে হেম সেন লেনে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে লেখাপড়া শেষ করে ফল পাই ১৯৮২ সালে। এর এক বছর পরেই এই চাকরি।
কিন্তু কর্মস্থল সে তো দুর্গম পথ। বাড়ি থেকে প্রথমে যেতাম চন্দ্রঘোনা। সেখান থেকে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে দোভাষীবাজার। এই জায়গা থেকে ২৪ কিলোমিটার পাহাড়ি উঁচু–নিচু হাঁটা পথ। রাজস্থলীতে সরকারি কোয়ার্টারেই থাকতাম কোনোমতে। কিন্তু বাড়িতে একবার এলে আর রাজস্থলীতে যেতে ইচ্ছা হতো না। সেখানে সপ্তাহে একবার হাট বসে। পনেরো দিন পরপর ডাক যায়। ঝড়বৃষ্টি হলে পথঘাটের অবস্থা এত খারাপ হয় যে চিঠিপত্র পেতে মাস পেরিয়ে যায়। খাওয়াদাওয়া নিয়ে খুব কষ্ট হতো। কারণ, খাওয়ার মতো কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট ছিল না। নিজে রান্না করতে না পারলে সেদিন উপোস।
এমন অবস্থায় দুই মাস পার করলাম। এত কষ্ট করে চাকরি করা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, চাকরি ছেড়ে দেব, কপালে যা থাকে।
সবচেয়ে বেশি অসহায় লাগত সন্ধ্যা হলে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে কোয়ার্টারে ঢুকতে হতো। চারদিকে নেমে আসত রাজ্যের অন্ধকার। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর জোনাকি পোকার আলো পাহাড়জুড়ে।
দু-তিনজন মিলে থাকতাম ‘টু-ইন কোয়ার্টারে’। সন্ধ্যা নামতে নামতে হারিকেন জ্বালিয়ে বসে বসে গল্প করা, এই ছিল কাজ। কিন্তু কত আর গল্প করা যায়! অগত্যা হারিকেনের আলো কমিয়ে যে যার রুমে শুয়ে থাকতাম। বিদ্যুৎ ছিল না। সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যম ছিল থানা থেকে ওয়্যারলেস।
সেখানে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন সুখশান্তি চাকমা। তাঁকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। আমার কষ্টের কথা শুনে তিনি বললেন, ‘বাবু, আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। যতই কষ্ট হোক চাকরি ছাড়বেন না, আরেকটা সরকারি চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত। আরেকটা যে পাবেন এমন নিশ্চয়তা বা কী।’
আমি তাঁর কথা শুনছিলাম। তিনি বললেন, ‘আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি। আপনি আমার পরিবারের সঙ্গে থাকেন। আমরা যা খাই, আপনিও খাবেন।’
সুখশান্তি স্যারের বদান্যতায় আমি যেন জীবনের পথ খুঁজে পেলাম। দীর্ঘ দুই বছর ওনার পরিবারের সঙ্গে ছিলাম। বউদি শিক্ষিত আর আন্তরিক মানুষ ছিলেন। তাঁর রান্নার হাত ছিল খুবই ভালো। বউদির হাতের শুঁটকি রান্না, নানা তরকারি মিশিয়ে সবজির পদ খুব পছন্দ করতাম।
এরপর আমরা দুজনই দুই জেলায় বদলি হই। একই বিভাগে ছিলাম, তবু সচরাচর দেখা হতো না।
এভাবে একদিন আমার অবসরের দিন এসে গেল। ২০১৫ সালে অবসরে গেলাম।
সুখশান্তি স্যারের কথা খুব মনে পড়ল। খোঁজ নিয়ে জানলাম, অবসরের পর স্যার রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে বাস করেন।
একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম স্যারের সঙ্গে দেখা করব। ২০১৯ সালে একদিন আমি পরিবার নিয়ে রাঙামাটিতে স্যারের বাসায় বেড়াতে গেলাম। অনেক বছর পর দুজনের দেখা। দুজনই আবেগাপ্লুত হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। বউদিও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। কত কথা, কত স্মৃতি মনে করে হাসাহাসি। দিনটা খুব আনন্দে কাটল। বউদি আমাদের খুব আপ্যায়িত করলেন।
বিদায়বেলায় কৃতজ্ঞচিত্তে বললাম, ‘স্যার, সেদিন যদি আপনি আমাকে সহানুভূতি না দেখাতেন, আমার জীবনটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেত। আপনার সৎ পরামর্শ আর বউদির আন্তরিকতা চিরদিন স্মরণে থাকবে।’ স্যারের পরিবার ও আমার পরিবার একসঙ্গে মুঠোফোনে ছবি তুলে রাখলাম।
আমার বয়স এখন ৭২ চলেছে। ১০ বছর হলো চাকরি থেকে অবসরে আছি। মাসে মাসে সরকারি পেনশন পাচ্ছি। সুখশান্তি স্যার এখনো বেঁচে আছেন। মাঝেমধ্যে কথা হয়। ভালো লাগে।