‘হাম আক্রান্ত ছেলের ছবি ফেসবুকে দিয়ে আয় করতে চাইনি’
সাত মাসের ছোট্ট আরহাম। খিদে পেলে তবেই যে কাঁদত, সেই শিশুটি এখন কারণ ছাড়াই কেঁদে ওঠে। চোখ ভরা অস্বস্তি, শরীরজুড়ে লালচে দাগ—হাম তাকে যেন হঠাৎ করেই অন্য এক জগতে নিয়ে গেছে। ছেলের এই কান্না দেখে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাবা মুশফিকুর রহমানের অসহায় লাগে। না–বলা কষ্ট নিয়ে তিনি ছেলের একটি ছবি তুলে পোস্ট করেন ফেসবুকে।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টটির শিরোনাম ছিল—‘রাষ্ট্র আমার সন্তানকে হাম উপহার দিল’। ২২ এপ্রিল ফেসবুকে দেওয়া ওই পোস্টে মুশফিকুর লিখেছেন, ‘এই দেশে তাকে জন্ম দেবার জন্য মাফ চেয়েছি। এমন এক দেশে তাকে এনেছি, যেই দেশের নেতারা জ্বর হলেও সিঙ্গাপুর যান। তাঁদের সন্তানেরা বিদেশে উন্নত জীবন যাপন করেন। গত কয়েক বছর নাকি আমাদের সন্তানদের জন্য টিকা কেনার প্রয়োজন তাঁরা মনে করেননি। আর সেই হাম মহামারি হয়ে আমার সন্তানের শরীরে চলে এসেছে।’
অল্প সময়েই এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা–সমালোচনা। মন্তব্যকারীদের অনেকেই আরহামের সুস্থতার জন্য দোয়া করলেও অনেকে পোস্টের ‘গত কয়েক বছর’ শব্দ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। টিকা কেনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি থাকলেও অন্য সরকারের প্রসঙ্গ কেন টেনে আনা হয়েছে, এমন যুক্তি দিয়েছেন কেউ কেউ। হামে সন্তান আক্রান্ত, এমন অবস্থাতেও একজন বাবা ফেসবুকে কেমন করে পোস্ট দেন, তা নিয়েও আবার প্রশ্ন তুলে আক্রমণ চালাচ্ছেন অনেকে।
নিজের শিশুকে নিয়ে মুশফিকুরের ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা–সমালোচনা। মন্তব্যকারীদের অনেকেই আরহামের সুস্থতার জন্য দোয়া করলেও অনেকে আবার পোস্টের ‘গত কয়েক বছর’ শব্দ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। টিকা কেনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি থাকলেও অন্য সরকারের প্রসঙ্গ কেন টেনে আনা হয়েছে, এমন যুক্তি দিয়েছেন কেউ কেউ।
‘ছবি পোস্ট করেছিলাম অসহায়ত্ব থেকে’
মুশফিকুরের বাড়ি বগুড়ায়। তাঁর ছেলে আরহাম এখন সেখানকার টিএমএসএস হাসপাতালে ভর্তি। গতকাল শনিবার মুঠোফোনে মুশফিকুর প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমে নিউমোনিয়া নিয়ে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। চিকিৎসক নিশ্চিত করেন যে হাম। তখন চারপাশ থেকে হতাশা ঘিরে ধরে। ছেলেকে কোলে নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার আগে তাঁর স্ত্রী শাহীনূর ফেরদৌসী একটি ছবি তোলেন। সেই ছবিই পরে ফেসবুকে পোস্ট করেন তিনি।
২২ এপ্রিল মুশফিকুরের দেওয়া পোস্টটি ফেসবুকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। ফেসবুকে এ ছবি থেকে তাঁর আয় হয়েছে ১৫ হাজার টাকার বেশি।
মুশফিকুর বলেন, ‘নিজের সন্তানের হাম হোক, তা আমি চাইনি। হাম আক্রান্ত ছেলের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে আয় করতে চাইনি। শুধু ছবিটি পোস্ট করেছিলাম হতাশা আর বাবা হিসেবে অসহায়ত্ব প্রকাশের জন্য আর ভুক্তভোগীরা ভোগান্তির কথা না জানালে অন্য মানুষ তা জানবে কেমনে?’
ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তারপরও সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে ফেসবুক থেকে ছেলের ছবি পোস্ট করে আয় করা টাকা হাম আক্রান্ত এমন কোনো পরিবারকে দেবেন, যাদের আসলেই টাকাটা খুব বেশি প্রয়োজন।
নিজের সন্তানের হাম হোক, তা আমি চাইনি। হাম আক্রান্ত ছেলের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে আয় করতে চাইনি। শুধু ছবিটি পোস্ট করেছিলাম হতাশা আর বাবা হিসেবে অসহায়ত্ব প্রকাশের জন্য আর ভুক্তভোগীরা ভোগান্তির কথা না জানালে অন্য মানুষ তা জানবে কেমনে?
ফেসবুকে তাঁর পোস্ট ঘিরে সমালোচনা প্রসঙ্গে মুশফিকুর, ‘আমাদের একটাই বাচ্চা। দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর থেকেই ছেলেকে নিয়ে সাবধানে থাকার চেষ্টা করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলের হাম হবে না। কিন্তু হয়েছে। আমি আমার পোস্টে কোনো সরকারের নাম উল্লেখ করিনি। আমি বলতে চেয়েছি, যে সরকার বা যাদেরই এ বিষয়ে গাফিলতি ছিল, তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। তদন্তে কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে শাস্তির আওতায় আনা হোক। ভবিষ্যতে যাতে আর কেউ শিশুদের জীবন নিয়ে এমন কিছু করতে না পারে।’
দেশে হাম পরিস্থিতি
মুশফিকুর ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর দিন ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়ানো, বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাবলির আলোকে সংস্থাটি এ মূল্যায়ন করেছে।
২২ এপ্রিল মুশফিকুরের দেওয়া পোস্টটি ফেসবুকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১২ মিলিয়ন ভিউ হয়েছে। ফেসবুকে এ ছবি থেকে তাঁর আয় হয়েছে ১৫ হাজার টাকার বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু; এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ দুই বছরের কম এবং ৩৩ শতাংশ ৯ মাসের কম বয়সী। প্রতিবেদনে ১৬৬ শিশুর সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্যও উল্লেখ করা হয়, যাদের অধিকাংশই টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা নেওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালে ৮৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৬ সালে ১১৮ শতাংশ হয়। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে ২২ শতাংশ থেকে থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১২১ শতাংশে পৌঁছায়। এ সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর হার কমে আসে। তবে ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক ও ২০২০–পরবর্তী সম্পূরক কর্মসূচি বন্ধ থাকায় এমআর১ ও এমআর২ কভারেজ আবার কমে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল শনিবার বলেছে, হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ২০৯ শিশুর মৃত্যু হলো। এ সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৬০ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
আগে থেকেই ছিল ভয়
ছেলের অসুস্থতার আগে থেকেই হাম পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন মুশফিকুর। নিয়মিত পোস্টে অন্যদের সতর্ক করেছেন। টিকার ঘাটতি, চিকিৎসা সংকট—সবকিছু নিয়েই লিখেছেন।
মুশফিকুর রহমান বলেন, ছেলে হামে আক্রান্ত হওয়ার আগ থেকেই তিনি ফেসবুকে নিয়মিতভাবে হাম নিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন এবং এখনো নিজের সন্তানের পাশাপাশি অন্য শিশুদের পরিস্থিতিও তুলে ধরছেন। ২৫ এপ্রিল তিনি বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত এক শিশুকে দেখতে গিয়ে ভিডিওসহ পোস্টে লেখেন, ওই হাসপাতালে শিশুদের জন্য পিআইসিইউ নেই, এতে অনেক শিশুর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। একই দিন আরেক পোস্টে তিনি লিখেছেন, তাঁর ছেলের হাসপাতালে ভর্তির ষষ্ঠ দিন চলছে।
শুধু নিজের সন্তানের জন্যই নয়, অন্যদের জন্যও সমানভাবে ব্যথিত মুশফিকুর। কোথাও পিআইসিইউ নেই, কোথাও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা—এই বাস্তবতা তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে।
অন্য শিশুদের জন্যও কষ্ট
শুধু নিজের সন্তানের জন্যই নয়, অন্যদের জন্যও সমানভাবে ব্যথিত মুশফিকুর। কোথাও পিআইসিইউ নেই, কোথাও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা—এই বাস্তবতা তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে।
২৪ এপ্রিল মুশফিকুর রহমান লেখেন, হাম আক্রান্ত প্রতিটি শিশুর কষ্ট একেকটি দুঃখগাথা, যার করুণ সাক্ষী বাবা-মায়েরা। এই কষ্ট দেখা বা বোঝানো কঠিন।
ওই পোস্টে তিনি আরও বলেন, ৯ মাস বয়সী এক হাম আক্রান্ত শিশুর পিআইসিইউ প্রয়োজন ছিল। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর তা পাওয়া যায়, তবে চিকিৎসক জানিয়েছেন, শিশুটি শেষ অবস্থায় থাকায় অযথা খরচ না করাই ভালো। আজ রোববার শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
মুশফিকুর নিজেও ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন। তারপরও সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে ফেসবুক থেকে ছেলের ছবি পোস্ট করে আয় করা টাকা হাম আক্রান্ত এমন কোনো পরিবারকে দেবেন, যাদের আসলেই টাকাটা খুব বেশি প্রয়োজন।
৩১ মার্চ আরেক পোস্টে মুশফিকুর হামে শিশুদের মৃত্যুকে ‘খুন এবং শিশু হত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। যে সরকারই দায়িত্বে অবহেলা করেছে, টিকার বিষয়ে উদাসীন ছিল সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
১ এপ্রিল এক পোস্টে মুশফিকুর রহমান হামের উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যুর খবর জানিয়ে অভিভাবকদের সন্তানকে অন্যের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার কথা বলেন।
ছেলের জন্য নিজেদের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে ৩ এপ্রিল মুশফিকুর এক পোস্টে লেখেন, ‘এমন এক সময়ে তোমার পৃথিবীতে আগমন, যখন অনেক শিশু হামে আক্রান্ত। বাবা–মায়েরা হাসপাতালে অসহায় অবস্থায় দিন–রাত পার করছেন।’
ছেলের কাশির শব্দ, জ্বর আর হামের কারণে মা–বাবা হিসেবে তাঁদেরও উদ্বেগে দিন কাটার কথা লেখেন তিনি ওই পোস্টে।
হামের টিকা নিয়ে যাদের অবহেলা ছিল, তাদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়টিতে মুশফিকুর গুরুত্ব দিয়েছেন একাধিক পোস্টে।
শিশুদের জন্য এক বাবার প্রার্থনা
এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও এখন কিছুটা স্বস্তির খবর আছে। মুশফিকুর বলেছেন, তাঁর ৭ মাস ১০ দিন বয়সী ছেলে আরহাম এখন অনেকটাই ভালো আছে। জ্বর কমেছে, কান্নাও কমেছে। এখন খেলনা নিয়ে খেলছে, মাঝেমধ্যে হাসছে। তবে নার্স দেখলে কান্নাকাটি করে। ছেলেকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরবেন—এটাই এখন তাঁর ভাবনা।
নিজের সন্তানের সুস্থতার পাশাপাশি অন্য শিশুদের কথাও ভুলছেন না মুশফিকুর। তাঁর শেষ কথাগুলো যেন সব মা–বাবার পক্ষ থেকে বলা—‘শুধু আমার সন্তান নয়, সবার সুস্থতা চাই। হাসপাতালে ভর্তি শিশুরা সবাই সুচিকিৎসা পাক, সরকারের কাছে এটাই চাওয়া।’