১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধিকার অর্জনের লড়াইয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর হাত ধরেই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং সেই পথরেখায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে বায়ান্নর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটা মনে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ যে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ফ্রেমের মধ্যে রেখে বিচার করাটা হবে সমস্যাজনক। পাকিস্তান যেহেতু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল, ফলে কেউ মনে করতেই পারেন যে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ড সাম্প্রদায়িকতার পথ ধরে ছিল। এর বিপরীতে বায়ান্নকে যদি এই বঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বা বাঙালিত্বের আত্মস্ফুরণের মুহূর্তকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এমন মনে হতে পারে যে তার আগপর্যন্ত পাকিস্তানের যে পর্ব—সেটা ছিল একটা সাম্প্রদায়িক সময়, আইয়ামে জাহেলিয়া বা একটা অন্ধকার যুগ। সাদা চোখে তলিয়ে না দেখলে এমনটা মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টাকে মোটেও এত সাদা-কালোয় ভাগ করা যায় না৷
পাকিস্তান আন্দোলন বা পাকিস্তান ধারণাটি যখন দানা বেঁধে উঠতে থাকে, ধারণাটি যখন মানুষের মুখে মুখে, চিন্তক বা রাজনীতিবিদদের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে, তখন ১৯২০-১৯৩০-এর দশকে কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবী-সম্পাদকেরা পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের পাকিস্তান জিন্নাহর পাকিস্তান থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন ছিল। রাজনীতিবিদদের কল্পিত মুসলমানের কল্পরাজ্য যে পাকিস্তান, সেটার থেকেও মৌলিকভাবে ভিন্ন ছিল বাঙালি মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কল্পিত পাকিস্তান। পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী, বাঙালি মুসলমান লেখক, বুদ্ধিজীবী কিংবা আইনজ্ঞরা যার ওপর জোর দিয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে ভারতে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না, তাই পাকিস্তান সৃষ্টি জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যে তাঁরা বারবার পূর্ব পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছিলেন। সেই স্বাতন্ত্র্যের কেন্দ্রে ছিল বাংলা ভাষা, সাহিত্য বা বাঙালির জীবনযাপন। আমরা যদি ফররুখ আহমেদের কবিতা দেখি, তাহলে দেখব সেখানে ইসলাম আছে, কিন্তু সেই ইসলাম আরব বা পাকিস্তানের মতো মরু-পাহাড়ের ইসলাম নয়; বরং সেখানে আছে জলজ একটা সমাজ, যেখানে তুফানে উত্তাল নদী আর দরিয়ার ঘনঘোর অন্ধকার রাত পাড়ি দিতে সাতসাগরের মাঝি আর সিন্দাবাদরা হাল ধরে।
অর্থাৎ পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করারও আগে পাকিস্তানের ধারণাটা যখন চালু হয়েছিল, তখনই বাঙালি মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের ধারণাটাতে সমর্থন জুগিয়েছিলেন। কিন্তু এর জন্য তাঁদের বাঙালিত্ব বিসর্জন দিতে হয়নি। তাঁরা মুসলিম জাতীয়তাবাদকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তার এর মানে এই নয় যে তাঁরা বাঙালিত্বকে এক পাশে ঠেলে সরিয়ে রেখেছিলেন; বরং গবেষকেরা দেখাচ্ছেন, পাকিস্তানের ভেতরেও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষিক, সাংস্কৃতিক কিংবা পরিবেশগত স্বাতন্ত্র্যকে সামনে নিয়ে আসাটা তাঁদের চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে ছিল। কাজেই বায়ান্নতেই আমরা প্রথমবারের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে মুখ ঘুরিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল রাজনীতির দিকে এলাম বলে আমাদের যে গড়পড়তা ধারণা, সেই ধারণাটাকে নিয়ে পুনর্ভাবনার প্রয়োজন আছে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কথা বলার অধিকার, মৌলিক অধিকারের জন্য যে লড়াইয়ের শুরু, কালক্রমে তা রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গিয়ে পৌঁছায়—১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের উত্থান, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ১৯৬৯ সাল হয়ে ১৯৭১ সালে একটা পরিণতির দিকে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যেতে দেখি। এই কালপর্বে আমাদের পূর্বনারী এবং পূর্বপুরুষেরা মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু তার অর্থ তো এটি নয় যে এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেদের মুসলমান পরিচয় ত্যাগ করেছিল বা ইসলামের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে রহিত করেছিল।
একাত্তরের পর বলা হয়েছিল যে একাত্তর ঘটেছে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য। কথাটা তলিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান। সাধারণভাবে তারা ধর্মপ্রাণ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তারা বাঙালিত্বকে আশ্রয় করেছে তা যেমন সত্য, একই সঙ্গে সত্য হলো যে বাঙালি পরিচয়কে সামনে আনতে গিয়ে তারা তাদের মুসলমানিত্বকেও অস্বীকার করেনি। একাত্তরের যুদ্ধের সময় তারা ভেবেছে, পাকিস্তানিরা কেমন মুসলমান যে তারা মসজিদের ওপর বোমা ফেলে কিংবা নিমগ্ন নামাজিকে গুলি করে মারে!
অর্থাৎ এখানে যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ঘটল, যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্তুঙ্গ সময়, সেই সময়েও মানুষ তার নিজের ধর্মপরিচয়কে রহিত করেনি বা বাদ দেয়নি; বরং পরবর্তীকালে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাঙালি ও মুসলমান যেমন পরস্পরবিরোধী পরিচয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে, এর আগে বাঙালি ও মুসলমান কার্যত কখনোই সে রকম পরস্পরবিরোধী সত্তা ছিল কি না, নাকি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙালি ও মুসলমান দুই পরিচয়কেই ধারণ করেছে, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
আমাদের কালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পেছনে প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষেরা যখন দাঁড়িয়েছেন, তখন তাঁরা ইসলামপন্থার রাজনীতিকে তাঁদের প্রতিপক্ষ জ্ঞান করেন; আবার ইসলামপন্থীরা যখন রাজনীতিতে সরব হয়ে ওঠেন, তখন তাঁরা বাঙালিত্বকে শত্রু হিসেবে জ্ঞান করেন। এই পরস্পরবিরোধিতার মূলে রয়েছে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্তর্গত সংকট—যার নিজেকে দাঁড় করাতে সব সময় একটা প্রতিপক্ষ লাগে, একটা ‘অপর’ লাগে। পাকিস্তানবিরোধী লড়াইয়ে ঢাল হিসেবে যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আমরা ব্যবহার করেছি, তখন আমাদের ‘অপর’ ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ, আমাদের ‘অপর’ ছিল পাকিস্তান। কিন্তু সেই সময়কার মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানের বিরোধিতা আজ অনূদিত হচ্ছে ইসলামের বিরোধিতা নামে। অথচ ১৯৭১ সালের পর যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই রাষ্ট্রে কি মুসলমান পরিচয়কে আমরা ফেলে দেব, নাকি দিতে পারব?
বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নিজেকে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে দেখানো, মুসলিম পরিচয়কে সাম্প্রদায়িক হিসেবে দেখানো কিংবা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা বাঙালি পরিচয়কে ইসলামপন্থীদের দিক থেকে ইসলামবিরোধী বা অনৈসলামিক হিসেবে দেখানো—এই চর্চাগুলো মূলত রাজনৈতিক। দুই পক্ষই নিজ নিজ রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
হালে অভিযোগ উঠেছে যে বাঙালিত্বের কথা যাঁরা বলেছেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িকতাকে নিশ্চিহ্ন করার নামে ইসলামকে গৌণ করে ফেলতে চান, রাজনীতির মাঠ থেকে মুছে দিতে চান, জনপরিসর থেকে আড়ালে নিতে চান। অন্যদিকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মাঠে ইসলামপন্থী রাজনীতির যখন উত্থান ঘটে, তখন তারাও দেখতে পান যে বাঙালিত্বের উদ্যাপনে অনৈসলামিক উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করতে চান, মঙ্গল শোভাযাত্রা নামটার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করেন, ছায়ানটে আগুন ধরিয়ে, উদীচীর কার্যালয়ে হামলা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে চান বা মুছে দিতে চান। অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামপন্থী পরিচয়ের রাজনীতি যখন তীব্র হয়ে ওঠে, সেটা পরিচয়ের উভয় বর্গ ধারণ করে যে মানুষেরা জীবন যাপন করেন, তাঁদের একটা বর্গ বেছে নেওয়ার এবং অপরটিকে বর্জন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এই দাবিতে বা চাপে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। কিন্তু এই দুই সংকীর্ণ রাজনীতির বাইনারি সাধারণ মানুষের জীবনকে কখনো ধারণ করতে পারে না। কারণ, সাধারণ মানুষের একটা বিরাট অংশ একাধারে বাঙালি ও মুসলমান—এই দুটো পরিচয়কেই ধারণ করেন।
জাতীয়তাবাদের বা পরিচয়ের রাজনীতির আরেকটা অন্তর্গত সংকটের কথা বলে শেষ করব। মুক্তিসংগ্রামের ঢাল বা অস্ত্র হিসেবে জাতীয়তাবাদ খুবই কার্যকর। কিন্তু সেই সংগ্রামে জাতীয়তাবাদ যখন বিজয়ী হয় এবং জাতিরাষ্ট্র গঠনের শক্তি হিসেবে কাজ করে, তখন সে নিজেই আধিপত্যশীল হয়ে ওঠে। যেকোনো জাতীয়তাবাদী কিংবা পরিচয়বাদী রাজনীতিরই এই সংকটটা থাকে। মুক্তির লড়াইয়ে ভূমিকা রাখা জাতীয়তাবাদ বা পরিচয় অপরের মুক্তির লড়াই বা অস্তিত্বকে পায়ের নিচে পিষে ফেলতে বা তাদের কণ্ঠস্বরকে চাপা দিতে ব্যবহৃত হতে পারে। আমরা সমতলে বাঙালি বনাম মুসলমানের লড়াইকে নিরন্তর চলতে দেখি। পাহাড়ে নানা জাতির মানুষেরা কিন্তু বাঙালি এবং মুসলমান দুই পরিচয়কে একাকার করে ব্যবহার করেন—কেননা সেখানে তাঁদের জীবন বিপন্ন হয় যে বর্গের দ্বারা, তাঁদের একটা বড় অংশ একাধারে এই দুই পরিচয়কেই ধারণ করেন। বায়ান্ন কিংবা একাত্তরকে ঘিরে সেখানে বাঙালি ও মুসলমানের কোনো বিবাদ কিন্তু নেই।
তাই বায়ান্নকে যদি আমরা জাতীয়তাবাদী ফ্রেমের ভেতর থেকে স্রেফ বাঙালির অর্জন হিসেবে দেখি, স্রেফ বাঙালিত্বের স্ফুরণ হিসেবে দেখি, তাহলে বায়ান্নকে খুবই সংকীর্ণ করে দেখা হবে। বায়ান্নর লড়াই যদি আমাদের কেবল বাঙালিত্ববাদী করে তোলে, তাহলে আমি বিহারিকে ঘৃণা করতে শিখব; বাঙালি বাদে অপরাপর জাতিগোষ্ঠী—যেমন চাকমা, মারমা, গারোদের বলে বসব যে ‘তোমরা বাঙালি হয়ে যাও’। মানে গতকাল পর্যন্ত আমি মজলুম ছিলাম, অথচ আজ নিজেই জালিম বনে গেছি।
এসব কথা মাথায় রেখে বলতে হয়, বায়ান্নকে যেন আমরা বাঙালিত্ব ছাপিয়ে সব মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের প্রতীক করে তুলতে পারি। বায়ান্ন যেন সব মুক্তিকামী মানুষের পাশে, আমাদের দাঁড়াতে শেখায়।
* মতামত: লেখকের নিজস্ব