কোথায় প্রতিরোধ, কোথায় সচেতনতা

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রতিবছর এই ভোরটিতে ভাষাশহীদদের প্রতি যেভাবে শ্রদ্ধা জানাই, ভোরে উঠে আজও সেভাবেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি। বলেছি, তোমরা তোমাদের রক্তের বিনিময়ে যেভাবে এই জাতিকে ভাষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের অধিকার দিয়েছ, তা অতুল্য। এই জাতির চিরকালের সম্ভাবনাকে তোমরা শক্তিমান করেছ।

আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার ভাষা কিছুটা আলাদা। ঢোল বাজিয়ে উৎসব জমিয়ে শ্রদ্ধা জানানো আমার ধাত নয়। আমার শ্রদ্ধা নিঃশব্দ ও বিচ্ছিন্ন। ব্যাপারটা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। চাপা হাসি আর অবিশ্বাস দিয়ে তারা একে তাচ্ছিল্য করে। কিন্তু এসব উতরেও আমি বিশ্বাস করি, উৎসব আর কর্মসূচি এক নয়।

মহত্তর কোনো উদ্দেশ্যে আমরা শরীর থেকে যে ক-ফোঁটা রক্ত মাটিতে ঝরাই, তাকে যদি কর্মসূচি বলি, তবে সারা বছর ঘুমিয়ে থেকে হঠাৎ একদিন শেষ রাতে পাড়ার বাগানগুলোকে তছনছ করা ফুলে তর্পণ সেরে একাডেমির বইমেলায় আনন্দ যাপন হলো উৎসব। কর্মসূচি শ্রম আর সমাপ্তির আত্মিক তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ। উৎসব সাময়িক ভোগের আবেগে স্থূল।

ভাষাশহীদদের রক্তের বিনিময়ে আজ পর্যন্ত দেশ, সংস্কৃতি বা রাষ্ট্রকে কীই-বা করতে পেরেছি আমরা, কতটুকুই-বা করেছি এ জন্য? নির্জীব ব্যর্থতা ছাড়া কীই-বা দিতে পেরেছি জাতিকে। আমাদের যে সংস্কৃতি এ জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ, তার সমৃদ্ধিতে কী অবদান আমাদের?

আমাদের শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গন আজ ক্রমাগত ক্ষীয়মাণ; নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জগৎ নিষ্পত্র ও উষর। এ কথা সত্যি যে পাঁচ হাজার বছরের জঞ্জালকে পঞ্চাশ বছরে ক্লেদমুক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রতিরোধ কোথায়, কোথায় সচেতনতা? কোথায় আমাদের সংশপ্তক কর্মশক্তি? চারপাশে শুধু হতাশার কণ্ঠস্বর আর নৈরাশ্যের বিলাপধ্বনি।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বা স্বাধীনতাযুদ্ধ আজ থেকে বেশি দূরের ঘটনা নয়। সেদিন আমাদের জাতির ভেতর এক অপরাজিত শক্তির অভূতপূর্ব উত্থান আমরা দেখেছিলাম। প্রতিটি মানুষ নিজের সর্বস্ব দিয়ে দেওয়ার জন্য কী আশ্চর্যভাবেই না সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। জাতির সেই শক্তি এত দ্রুত মৃত্যুকবলিত হয়ে যেতে পারে, এ কথা বিশ্বাসের বাইরে।

আমাদের আজ যা দরকার, তা চিত্তের ঐশ্বর্য, মূল্যবোধের সমৃদ্ধি। ছোট মানুষ আর বড় জাতি একসঙ্গে হয় না। তাই আমাদের চাই বড় মানুষ, উচ্চায়ত মানুষ। সোনার বাংলা মানে এই নয় যে এ দেশের বাড়িগুলো, রাস্তাগুলো, পুকুরগুলো সোনার।

এর মানে এ দেশের মানুষগুলো সোনার। সেই সোনার মানুষ গড়ে তোলার জন্য আজ আমাদের চাই আরেক মুক্তিযুদ্ধ। আমরা যেন না ভুলি: ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় না।’