৭২ কোটি টাকার মৈত্রীস্তম্ভের এখন কী হবে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ এখনো উদ্বোধনের অপেক্ষায়ছবি: শাহাদৎ হোসেন

দেয়ালজুড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা দৃশ্য। দেয়ালের একাংশে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ–ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের খোদাই করা চিত্র, কোথাও যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে শিশু-নারী-পুরুষের মাথায় সহায়সম্বল তুলে ভারতে পায়ে হেঁটে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। আবার কোথাও বৃদ্ধ মাকে কাঁধে তুলে নেওয়ার করুণ চিত্র, অনাহারে ক্লান্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি।

এসব চিত্র খোদাই করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভে’। মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে নির্মিত এ স্মৃতিস্তম্ভ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। তবে এখনো এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।

অন্যদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের ধুলাবালু এবং আশপাশের চাতালকলের কালো ধোঁয়া ও তুষে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে এই স্মৃতিস্তম্ভের পরিবেশ ও সৌন্দর্য।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম প্রথম আলোকে স্মৃতিস্তম্ভটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, তাহলে এই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মিত্রবাহিনীর অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ উদ্বোধনের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে ২০১৭ সালে আশুগঞ্জে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৭২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০২৪ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো উদ্বোধন হয়নি।  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এক মাস হলো। এখন সরকারপ্রধানের সামনে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ উদ্বোধনের বিষয়টি তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করেছে। যেহেতু মৈত্রীস্তম্ভটি পড়ে আছে, এটি দ্রুত চালু করা উচিত। না হলে স্থাপনা নষ্ট হয়ে যাবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভে’ তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি টাকা
ছবি: প্রথম আলো

প্রকল্পের ব্যয় ও নির্মাণ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে আশুগঞ্জে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সময়ও নির্ধারণ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৪৭ কোটি টাকা করা হয়। এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হয়নি। পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৭২ কোটি টাকা করা হয়।

জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি বলে জানান মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। শেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তখন ক্ষমতায় অন্তর্বর্তী সরকার।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। তারপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সৈন্যরাও যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধে সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হন।

উদ্বোধনের আগেই বিবর্ণ

এ মাসের শুরুতে সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকেই চোখে পড়ে আশুগঞ্জের কামাউরা এলাকায় ‘মৈত্রীস্তম্ভ’। প্রবেশের দুটি ফটক, ভেতরে ঢুকতই চোখে পড়ে পশ্চিমাংশে দেয়ালে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খোদাই করা চিত্র। সেখানে সিকান্‌দার আবু জাফরের কবিতা থেকে লেখা—‘আমার কাঁধেই নিলাম তুলে তোমার যত বোঝা, তুমি আমার বাতাস থেকে মুছো তোমার ধুলো, তুমি বাংলা ছাড়ো।’ পাশেই খোদাই করা লেখা রয়েছে—‘দৈনিক পাকিস্তান বাংলা এবারের মুক্তির সংগ্রাম জয় বাংলা’ ও ‘এ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’।

উপজেলার উদ্বোধনযোগ্য স্থাপনার তালিকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চেয়েছে। আমরা তালিকা করেছি। এখন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।
রাফে মোহাম্মদ ছড়া, ইউএনও, আশুগঞ্জ

দক্ষিণ দিকের পার্কের পশ্চিমাংশে দেয়ালে ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের শিকল, কারাগারের বন্দিদশা, ১৯৬২ সালের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের প্রতিবাদ, জাতীয় নেতাসহ নানান ছবি খোদাই করা হয়েছে। দক্ষিণ দিকের পার্কের পূর্ব পাশের অস্ত্র হাতে মিত্রবাহিনীসহ তাঁদের হেলিকপ্টার-যুদ্ধবিমান-গোলাবর্ষণের অস্ত্র ও ট্যাংক এবং রেডিও ও অস্ত্র হাতে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের নানান চিত্র।

উদ্বোধনের আগেই ধুলাবালু আর চাতালকলের ধোঁয়ায় বিবর্ণ হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’
ছবি: প্রথম আলো

মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচের চারপাশে ব্রোঞ্জে (পিতল) লেখা মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাসদস্যদের নাম। তার মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৪৮২ জন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদের সদস্য, ভারতীয় ইস্টার্ন থিয়েটার সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ২৯ জন সদস্য, ভারতীয় ইস্টার্ন থিয়েটার বিমানবাহিনীর ১১ জন, ভারতীয় নৌবাহিনীর ৬ জন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ জন কর্মকর্তা ও জেসিও পর্যায়ের ৭০ জন সদস্যের নাম।

প্রকল্পের দুটি ফটকের মাঝখানে ভেতরে একটি পানির ফোয়ারা, স্মৃতিস্তম্ভের পশ্চিমাংশে ৮টি এবং পূর্ব পাশে ১০টি এবং স্মৃতিস্তম্ভের পেছনে ১৪টি দোকান (ফুড কোর্ট) ও একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের নিচের অফিস ও সংগ্রহশালা বা জাদুঘর এবং পেছনে শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্ক রয়েছে। তবে সর্বত্রই ধুলাবালু ও চাতালকলের কালো ধোঁয়ার চিহ্ন স্পষ্ট।

আউটসোর্সিংয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তাকর্মী মো. মফিজুল হক ও জয় সমাদ্দার শুভ, গার্ডেনার মো. শাহীনুর এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী আশিষ চন্দ্র দাস ও পলাশ হরিজন সাত মাস ধরে এটি দেখাশোনার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করছেন। তাঁরা বলেন, সাত মাস ধরে তাঁদের কোনো বেতন হচ্ছে না।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী পলাশ হরিজন বলেন, ‘দুই দিন পরপরই পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ধুলাবালু জমে।’  

মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় নির্মিত হয়েছে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’
ছবি: প্রথম আলো

গণপূর্ত বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোফাজ্জেল আলী খাদেম প্রথম আলোকে বলেন, স্মৃতিস্তম্ভ ও শিশুদের জন্য নির্মিত পার্কটি গত বছর আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর পর থেকে আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এটি রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশোনা করছে।  

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডেভেলপারস সূত্রে জানা গেছে, স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে কার্পেট খাস, বিভিন্ন ধরনের হেজ (দেয়ালের ওপর সবুজ ঘাস), রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া ও বিভিন্ন ধরনের অর্নামেন্টাল গাছ লাগানো হয়েছে। ব্যবহার না হওয়ায় এসব নষ্ট হচ্ছে।

আশপাশের চাতালকলের জন্য স্মৃতিস্তম্ভটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অনেক কঠিন বলে মন্তব্য করেন আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফে মোহাম্মদ ছড়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বছরখানেক আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশ এলাকার চাতালকল অন্যত্র সরানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়।

ইউএনও জানান, উপজেলার উদ্বোধনযোগ্য স্থাপনার তালিকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চেয়েছে। তারা তালিকা করেছেন। এখন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।