শহীদ মিনারে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষশ্রদ্ধা, গার্ড অব অনার
বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। আজ মঙ্গলবার বেলা একটার কিছু আগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিল্পীর মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের আধুনিক পাপেটের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা হবে। এর আগে সকালে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল যাঁদের হাত ধরে, তিনি তাঁদের অন্যতম। এখানে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল নয়টায় তাঁর প্রথম জানাজা হয়।
শিল্পীকে শেষবারের মতো নেওয়া হবে তাঁর প্রথম কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে। পরে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে শিল্পীকে।
শিল্পের বহু মাধ্যমের অঙ্গন আপন সৃজনপ্রতিভায় রাঙিয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। খোদ সত্যজিৎ রায় মুগ্ধ ছিলেন তাঁর জলরঙের ছবিতে, তাঁর প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’ নাটকে। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার পুষ্পস্তবক নিবেদনের সময় যে রক্তিম সূর্য চোখে পড়ে মিনারের স্তম্ভগুলোর নেপথ্যে, সেটির সংযুক্তিও তাঁর হাত ধরে। জীবনের ৯০ বছরের পরিক্রমা শেষে গতকাল সোমবার অনন্তলোকের পথে যাত্রা করেন সবার প্রিয় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।
অনেক দিন ধরে প্রবীণ এই শিল্পীর শরীর ভালো যাচ্ছিল না। পরিবার সূত্রে জানা গেল, বছরখানেক ধরে মাঝেমধ্যেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছিল। সর্বশেষ স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল গত ঈদুল আজহার পর। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় ১৪ জুন তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসায় আর উন্নতি হয়নি। গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান তিনি। স্ত্রী মেরী মনোয়ার, ছেলে সাদাত মনোয়ার, মেয়ে নন্দিনী মনোয়ারসহ আত্মীয়স্বজন ও দেশ-বিদেশে বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর সংবাদে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে বিষাদ নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।
বহুবর্ণ এক জীবন
মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, মাগুরার নাকোল গ্রামে। বাবা কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মা জামিলা খাতুন। অল্প বয়সে মাতৃবিয়োগ হয়। শৈশব থেকেই ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। নারায়ণগঞ্জে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ছবি এঁকে প্রদর্শনী করেছিলেন। সে কারণে তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল।
ম্যাট্রিক পাস করেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয় থেকে। এরপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান কলকাতায়। প্রথমে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। তবে পড়ালেখা তেমন এগোয়নি। সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রেরণায় ভর্তি হন কলকাতা আর্ট কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
সংগীতের প্রতি অনুরাগ ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। আর্ট কলেজে পড়ার সময় ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে গান শেখা শুরু করেন। পরে দীর্ঘদিন চর্চা চলে নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে যুক্ত থেকে। হিজ মাস্টার্স ভয়েসের এক প্রতিযোগিতায় প্রথমও হয়েছিলেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে ১৯৬০ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা আর্ট কলেজে। শিক্ষকতার পাশাপাশি অনেক মঞ্চনাটকে সেট নির্মাণ করেছেন। কাজ করেছেন আধুনিক পাপেট নিয়ে। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় টেলিভিশনের যাত্রার সঙ্গে যুক্ত হন। টেলিভিশনে তিনি ‘পারুল’ নামে পাপেট চরিত্র সৃষ্টি করেন। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরু হয় তাঁর হাত দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’সহ অনেক বিখ্যাত নাটকের প্রযোজনা করেছেন।
মুস্তাফা মনোয়ার সর্বাধিক জনপ্রিয় হন আধুনিক পাপেটের পথিকৃৎ হিসেবে। পাকিস্তান আমলেই টেলিভিশনে তিনি পাপেট শো শুরু করেন। পরে জনপ্রিয় ‘মীনা কার্টুন’ ও ‘সিসিমপুর’ তাঁর পরামর্শে পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’। দায়িত্ব পালন করেন শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে। সংস্কৃতি অঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পান। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে সুলতান স্বর্ণপদক, ২০১২ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।