‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করতে আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ৫ জানুয়ারি এ সিদ্ধান্ত হয়।এরপর আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে খসড়া তৈরি করেছে।
প্রশ্ন ও উত্তরে জানা যাক দায়মুক্তির নানা দিক।
প্রশ্ন: দায়মুক্তি কী?
উত্তর: সাধারণ সময়ে আইনের দৃষ্টিতে অনেক ঘটনা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। তবে যুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেই সব ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। যখন রাষ্ট্র কোনো বিশেষ আইন পাস করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ব্যক্তিদের কিংবা গোষ্ঠীকে তাঁদের অতীতের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য বিচার বা আইনি প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়, তখন তাকে দায়মুক্তি বলা হয়। এর ফলে ওই কাজের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা বা শাস্তি দেওয়া যায় না।
সাধারণত জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ, জনশৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে কোনো কর্মকাণ্ডকে অপরাধের পর্যায় থেকে মুক্তি দিতে দায়মুক্তি আইন হয়ে থাকে। সাধারণত, যুদ্ধ এবং গৃহযুদ্ধের পর দায়মুক্তি আইনের বিষয়টি আসে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সুযোগের অপব্যবহারও হয়।
প্রশ্ন: দায়মুক্তির প্রসঙ্গটি কীভাবে এল?
উত্তর: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঘটনাবলির জন্য দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি অনেক দিন ধরেই রয়েছে। গত বছর অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আদেশ জারি করে যে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট ঘটনার জন্য কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না। সুনির্দিষ্টভাবে ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংগঠিত গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঘটনাগুলোকে মাথায় রেখে এরূপ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ৫ আগস্ট জারি করা জুলাই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।’
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি আবার সামনে আসে। জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেওয়া তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে গত ২৫ ডিসেম্বর এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে ৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের এক দিন পর মাহদী ও ১১ দিন পর সুরভী জামিন পান।
এমন পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৪ জানুয়ারি তিন দফা দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সংবিধানে কি দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ আছে?
উত্তর: দায়মুক্তির বিষয়ে সংবিধানের ৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে যে সংবিধানে মৌলিক অধিকার নামে যা-ই স্বীকৃত থাকুক না কেন, তা সত্ত্বেও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে বা দেশের ঘোষিত রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যেকোনো অঞ্চলে শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য সংসদ আইন প্রণয়ন করে দায়মুক্তি দিতে পারবে।
সরকারের সূত্রে জানা গেছে, সংবিধানের এই বিধানের অন্তর্নিহিত ভাব থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তির আইনটি করতে চাইছে।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের জন্য কীভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদে ১৯৭৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার জারি করেন। এতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কাজের জন্য, অথবা ১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সম্পাদিত কোনো কাজের জন্য, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো মামলা, ফৌজদারি কার্যক্রম বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা দায়ের করা যাবে না।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো দায়মুক্তির উদাহরণ আছে কি?
উত্তর: আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু সেনা কর্মকর্তার হাতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হন। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করার পথ বন্ধ করে দেন।
অধ্যাদেশে বলা হয়, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে সংঘটিত ঐতিহাসিক পরিবর্তন এবং সামরিক আইন জারির সঙ্গে সম্পর্কিত, অথবা সে উদ্দেশ্যে কোনো পরিকল্পনার প্রস্তুতি, বাস্তবায়ন কিংবা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কার্য বা বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বা অন্যান্য কার্যধারা গ্রহণ সীমিত করা সমীচীন বলে বিবেচিত হয়েছে।’
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে এই আইনকে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এই আইনকে বিলুপ্ত করে দিয়ে পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া চালু করে। পরে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অনেকেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাস দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মাধ্যমে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীকে মাঠে নামায়। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি সময়ের মধ্যে ‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করার ক্ষেত্রে যৌথ বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার যাতে বিচার না হয়, সে জন্য ২০০৩ সালে যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন পাস করা হয়।
অবশ্য আইনজীবী জেড আই খান পান্নার করা এক জনস্বার্থের মামলা শুনানি শেষে ২০১৫ সালে উচ্চ আদালত এই আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় ৫৮ জনের মতো ব্যক্তি ‘হার্ট অ্যাটাকে’ মৃত্যুবরণ করেন অথবা যৌথ অভিযানে নিহত হন। অনেকে আহত হন।
প্রশ্ন: বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তির বিষয়টি কী?
উত্তর: প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া কাজ দিতে ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এই আইনের অধীন কোনো সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, এমন বিধান থাকার কারণে এটি দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত পায়।
এদিকে গত বছর আগস্টে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক ও মো. তায়্যিব-উল-ইসলাম আইনটির বিরুদ্ধে আদালতে রিট আবেদন করেন। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ আগস্ট বিশেষ বিধান আইন স্থগিতের ঘোষণা দেয়। বলা হয়, এ আইনের অধীন ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম আপাতত বন্ধ থাকবে।
রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ নভেম্বর আদালত আইনটি বাতিলের রায় দেন। ৩০ নভেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই দায়মুক্তি আইন বাতিল করে গেজেট প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রশ্ন: বিশ্বের অন্য দেশে কি দায়মুক্তির উদাহরণ আছে?
উত্তর: দায়মুক্তির বহু উদাহরণ আছে। ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশটির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে পুনরায় ইউনিয়নে ফিরিয়ে আনা। এর জন্য ১৮৭২ সালে ‘অ্যামনেস্টি অ্যাক্ট’ করা হয়। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক সাবেক সেনাসদস্য এবং কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর সমালোচনাও আছে।
১৫ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লেবানন ১৯৯১ সালে একটি সাধারণ ক্ষমা আইন পাস করে। এর উদ্দেশ্য ছিল সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করা এবং একটি জাতীয় সরকার গঠন করা। এই আইনের অধীনে গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত রাজনৈতিক অপরাধগুলোর জন্য সব পক্ষকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন বা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁরা কখনোই আইনি বিচার পাননি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী জার্মানির বিভিন্ন শহরে বোমা বর্ষণ করে। এতে অনেক বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারায়। জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা হামলায় দুই থেকে তিন লাখ মানুষ মারা যায়। বেসামরিক লোকজন মারা গেলেও কোনো দায়মুক্তি আইন করা হয়নি। মিত্রবাহিনীকে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নাৎসি নেতাদের এবং টোকিও ট্রাইব্যুনালে জাপানি নেতাদের বিচার করা হয়। এটিকে অনেক গবেষক ‘ভিক্টর জাস্টিস বা বিজয়ীদের বিচারব্যবস্থা বলে থাকেন। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো দুনিয়া পরিচালিত হয় মিত্রশক্তির নেতৃত্বে।