গত রোববার রাত সাড়ে নয়টায় ক্যাম্পাসে পাঁচ তরুণের হাতে এক ছাত্রী যৌন নিপীড়ন ও মারধরের শিকার হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় পাঁচ তরুণ ওই ছাত্রীকে বেঁধে বিবস্ত্র করে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক বন্ধু প্রতিবাদ করলে তাঁকেও মারধর করা হয়। এ ঘটনায় গত বুধবার মামলা হয় হাটহাজারী থানায়। এরপর শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। একপর্যায়ে গত বুধবার রাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন ছাত্রীরা। ঘটনার চার দিন পার হয়ে গেলেও এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি হাটহাজারী থানা-পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিরীণ আখতার প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার বিচারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

এদিকে ওই ছাত্রীর সঙ্গে কাউকে যোগাযোগ করতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, ওই ছাত্রীর পরিবারের সদস্যরা বাদে আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঘটনার পর থেকে হলেও থাকছেন না।

default-image

বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকদের সংহতি

গতকাল বেলা ১১টা, প্রশাসনিক ভবন চত্বর। শিক্ষার্থীদের লম্বা লাইন। সবার হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান, ‘বোনের গায়ে হাত কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘যৌন নিপীড়ক বাইরে কেন, জবাব চাই, জবাব চাই’। ‘যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নারী, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিরাপত্তা নেই, লজ্জাজনক’, ‘ধর্ষকেরা বন্দী হয়নি/ বুক ফুলিয়ে চলে, তোমরা বরং ছাত্রীদের ক্লাস করাও হলে’।

প্রশাসনিক ভবনের সামনে রসায়ন বিভাগের এই শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন চলে ৩০ মিনিটের মতো। তারপর মিছিল নিয়ে তাঁরা চলে আসেন শহীদ মিনার চত্বরে। সেখানে যোগ দেন বিভিন্ন বিভাগের হাজারখানেক শিক্ষার্থী ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতা-কর্মীরা। এক শিক্ষার্থী চোখে কালো কাপড় ও বুকে ‘প্রশাসন’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে চত্বরে বসে পড়েন। একপর্যায়ে এসে যোগ দেন শিক্ষকেরা।

শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের হানিফ সিদ্দিকী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের খ. আলী আর রাজী, সংস্কৃত বিভাগের লিটন মিত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের হেলাল উদ্দিন আহমদ প্রমুখ।

শিক্ষার্থীরা বলেন, এত দিন ক্যাম্পাসের বাইরে, শাটল ট্রেন, বাসে ছাত্রীরা হেনস্তা হয়েছেন, ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। এবার ক্যাম্পাসের ভেতরেই এক ছাত্রীর পোশাক খুলে ফেলা হয়েছে। যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। বিচার নিয়ে প্রশাসনের ঢিলেমি স্পষ্ট হয়েছে। আগের ঘটনাগুলোরও বিচার হয়নি। সব ঘটনার বিচার করতে হবে।

অকার্যকর সেল

ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের বিষয়ে তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যৌন হয়রানি নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র’ রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় এটি গঠিত হয়। ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল দুই বছরের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন উপাচার্য শিরীণ আখতার। দুই বছর আগে মেয়াদ পার হলেও নতুন কমিটি হয়নি।

এ কমিটির কাছে তিনটি ঘটনার অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে হেনস্তার শিকার হন দুই ছাত্রী। ছাত্রলীগের চার কর্মী ওই দুই ছাত্রীকে হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কারও শাস্তি হয়নি। এ ছাড়া ২০১৮ সালের শেষ দিকে দুই ছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হন বলে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। এ দুই অভিযোগেরও নিষ্পত্তি হয়নি।

সেলের অভিযোগের বাইরে আরও তিনটি ঘটনার সুরাহা হয়নি। গত ৩০ জুন ক্যাম্পাসের গোলচত্বর এলাকায় দুই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার একজন চালক। এ ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডি একটি মুচলেকা নিয়ে চালককে ছেড়ে দেয়। একই দিন এক ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের একজন কর্মীর বিরুদ্ধে। ওই ছাত্রী প্রক্টর রবিউল হাসান ভূঁইয়ার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। ওই ছাত্রী বলেন, প্রক্টরিয়াল বডি থেকে তাঁকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

এর আগে গত ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটল ট্রেনে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন এক ছাত্রী। অজ্ঞাতনামা দুই যুবকের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ ওঠে। সাড়ে তিন মাস হতে চললেও এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।

এদিকে যৌন হয়রানি নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র থাকার পরও সর্বশেষ ছাত্রীকে নিপীড়নের ঘটনা তদন্ত করতে নতুন পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক।

ঢাবিতে মানববন্ধন, আসকের বিবৃতি

গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক মানববন্ধনে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, যৌন নিপীড়নের ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে৷ একই ঘটনার বিচার দাবি করেছে ছাত্র অধিকার পরিষদ। গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক বিক্ষোভ সমাবেশে পরিষদের নেতারা এ দাবি জানান।

এ ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল ভেঙে নতুন করে গঠন করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা দিতে হবে ছাত্রীদের।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন