সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ আইন চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হবে: শিশির মনির
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ অর্থাৎ আইনটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করে যে রহিতকরণ বিল পাস হচ্ছে, এটা পৃথক আইন। এই আইনের গেজেট চ্যালেঞ্জ করবেন হাইকোর্টে।
হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবন প্রাঙ্গণে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শিশির মনির।
যে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়ে রায় দিয়েছেন, সেই রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী শিশির মনির। সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়ে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি চলতি সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।
হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শিরোনামে গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। আজ বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করা হয়।
হাইকোর্টের রায় ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে বক্তব্য জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন শিশির মনির। তিনি বলেন, ‘আইন (রহিতকরণ বিল) সংসদে পাস হয়েছে। এই আইনের গেজেট জোগাড় করব। রিট আবেদন দায়েরের মাধ্যমে আইনটি অসাংবিধানিক ঘোষণার জন্য আদালতে উপস্থাপন করব।’
শিশির মনির বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় থাকা অবস্থায় কোনো আইন পাস করে সেই রায়টা অকার্যকর করা হচ্ছে। এটা কিছুটা সাংঘর্ষিক। এই সংঘাত যাঁরা লাগাচ্ছেন…আগুন নিয়ে খেলছেন। আগুন নিয়ে খেলা উচিত না। আগুনের সঙ্গে খেলতে গেলে কী হয়—এটা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আপনারা শিক্ষা নেবেন, আমরা সকলেই শিক্ষা নেব।’
রায়ে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধন হয়েছে এবং আংশিক কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, ‘আজকে অধ্যাদেশটি তাঁরা রহিতকরণ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা যুক্তি দেখাচ্ছেন হাইকোর্টের এই রায় আপিলের পরে কার্যকর হবে, আপাতত কার্যকর হবে না। আমরা মনে করি এটিও সঠিক ব্যাখ্যা নয়।’
আপিল ফাইল করার আগে সচিবালয়ের আইন বিলুপ্ত করে দিলেন উল্লেখ করে সরকারের উদ্দেশে শিশির মনির বলেন, ‘সরকারের আপিল কি আপিল বিভাগ মঞ্জুর করেছেন? কিন্তু যে কাজটা করছেন, যেন আপিলে হাইকোর্টের রায় উল্টো গেছে। ওলটানোর ফলে যা হওয়ার কথা, তা আপিল ফাইল না করেই করে ফেলেছেন। এটার নাম শক্তি। শক্তি বিচার বিভাগের সঙ্গে এভাবে দেখাতে হয় না।’
‘বিরল নজির, কালো ব্যাজ ধারণ করা উচিত’
ওই ঘটনার জন্য সারা দেশের বিচারক ও আইনজীবীদের ‘কালো ব্যাজ’ ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, মুখে কালো কাপড় পরা উচিত। এভাবে কোনো একটা অঙ্গের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেওয়া যায় প্রতিষ্ঠা (সচিবালয়) হওয়ার পরেও? এটি হলো একটি বিরল নজির।
শিশির মনির আরও বলেন, ‘অতীতে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পরে এটিকে এভাবে ডেসট্রয় (ধ্বংস) করা যায়, নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়—তার একটি বাস্তব নমুনা আমরা দেখতে পেলাম। দিস ইজ আ প্রিসিডেন্স হুইচ ইজ ব্যাড ইন নেচার (এটি খারাপ প্রকৃতির নজির)। নো বডি শুড অ্যাপ্রিসিয়েট দিজ টাইপ অব অ্যাক্ট বাই দ্য গভর্নমেন্ট (সরকারের এ ধরনের কাজের প্রশংসা করা কারও উচিত হবে না)।’
সরকারের কাছে প্রত্যাশা
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের রায় এখন পর্যন্ত বলবৎ আছে। সুপ্রিম কোর্টের কোনো স্থগিতাদেশ নেই। চেম্বার আদালতে আবেদন দেওয়া হয়নি। স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন (সিএমপি) দায়ের করা হয়নি।
‘আমরা প্রত্যাশা করব, সরকার এগুলো থেকে ফিরে আসবে। যে সংগ্রামের ভিত্তিতে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটা এ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, খামখেয়ালি করে কিংবা জেদের বসে এসব কাজ করা মোটেও সমীচীন হচ্ছে না।’
এক প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, আজকে যে আইনটি পাস করেছে, তার মাধ্যমে পৃথক সচিবালয়ের কাজ বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। এই যে বিলুপ্তি, একটা প্রতিষ্ঠিত সচিবালয়কে বিলুপ্তি করার মাধ্যমে যে ধরনের কার্যক্রম প্রদর্শন করা হচ্ছে, এটি আবার বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ইংরেজিতে বলে ‘হুইটেল ডাউন’ অর্থাৎ ভেঙে খান খান করে দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে রিট আবেদনকারী আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, মো. মিজানুল হক, আব্দুলাহ সাদিক, আমিনুল ইসলাম ও যায়েদ বিন আমজাদসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।