কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক মুক্ত সুবিধার পরিধি বাড়ানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় যে সব প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়টি আলোচনায় তুলবে বাংলাদেশ।

জানা গেছে, চীনের দিক থেকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারত্বকে যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় সেটির উল্লেখ থাকবে। ভূ–রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রসঙ্গগুলো তোলা হতে পারে।

ব্যবসা–বাণিজ্যে জোর

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক মুক্ত সুবিধার পরিধি বাড়ানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হবে। চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ১০০ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চাইবে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। আর আমদানি করে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের পণ্য। বাণিজ্যের ওই বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধার পরিধি বাড়ানোর অনুরোধ জানাবে।

এ ছাড়া এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ১৪০ কোটি ডলার। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চীনকে দেওয়া হয়েছে। আনোয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে।

প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই প্রকল্পগুলোতে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা চীনের। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে এসব সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা হবে।

জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত চীনের প্রকল্পগুলোর মধ্যে আটটি প্রকল্পের ঋণচুক্তি সই হয়েছে। ওই আটটি প্রকল্পের ব্যয় ৭৮০কোটি ডলার হলেও এ পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার।

ভূ-রাজনীতিতে মনোযোগ চীনের

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে ঘিরে তাইওয়ান–চীনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ২ আগষ্ট ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফরের পর থেকেই চীন বন্ধুপ্রতীম অনেক দেশের মত বাংলাদেশকেও ‘এক চীন’ নীতি নিয়ে বিবৃতি দেওয়ার অনুরোধ জানায়। বাংলাদেশ গত বৃহস্পতিবার এক চীন নীতিতে বিশ্বাসী বলে একটি বিবৃতি দিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চীনের পার্লামেন্ট ন্যাশনাল পিপল্স কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি ঝ্যাংশু সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনায় জিএসআই এবং জিডিআইয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১৯ জুলাই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় লি ঝ্যাংশু বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিশ্বের সব দেশের অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সারাবিশ্বের জনগণের স্বার্থে চীন জিডিআই এবং জিএসআইয়ের মত উদ্যোগগুলো নিয়েছে। যৌথভাবে বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এসব উদ্যোগে সমর্থন ও সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে এটাই প্রত্যাশা করে চীন।

জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে চীনের পার্লামেন্ট ন্যাশনাল পিপল্স কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের এক কূটনীতিক বলছেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে জিডিআই ও জিএসআইয়ের মত প্রসঙ্গগুলো আলোচনায় আনতে পারেন। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ-জিএসআই) এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-জিডিআই) ঘোষণা দিয়েছেন। সারাবিশ্বের ‘অবিচ্ছেদ্য নিরাপত্তা’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে গত এপ্রিলে সি চিনপিং জিএসআইয়ের ঘোষণা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, জিএসআই ঘোষণার মধ্য দিয়ে চীন সারাবিশ্বে বন্ধুপ্রতীম পরাশক্তির ভাবমূর্তি প্রতিস্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্টের ঘোষিত জিডিআইকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, আমরা এখন কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের মোকাবিলার মত বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ব্যস্ত। ফলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে জিডিআই, জিএসআইয়ের মত বিষয়গুলো এলেও বিভিন্ন পরাশক্তির মাঝে যে বিষয়গুলোতে বৈরিতা চলছে, তাতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের তেমন একটা আগ্রহ নেই।

আলোচনায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক জোট আইপিইএফের (ইন্দো প্যাসিফিক ইকোনমিক ফোরাম) বিষয়টিও চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রী তুলতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ধারণা। কারণ গত মে মাসে আইপিইএফ ঘোষণার পরপরই ঢাকা ও বেইজিংয়ে বসে চীনের কূটনীতিকেরা বাংলাদেশকে ওই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

চীন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে আগ্রহী। এখন ঢাকা সফরের সময় ওয়াং ই কি বার্তা নিয়ে আসে সেটা বাংলাদেশ শুনবে। এরপর নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বাংলাদেশ অবশ্যই চীনের সহযোগিতা চাইবে।

জানতে চাইলে পররাস্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন আজ শুক্রবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশ আলোচনায় তুলবে। তবে প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ ফেরাটা জরুরি। তাই রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ দিতে চীনকে অনুরোধ জানানো হবে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েক বছর পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ। সফরটি সংক্ষিপ্ত হলেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়গুলো যেমন গুরুত্ব পাবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের ঘটনাপ্রবাহও আলোচনায় আসবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন