শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেও ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি

কোলাজ : প্রথম আলো

আলোচিত কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনেও। ভুয়া তথ্য, পুরোনো ছবি ও এআই–নির্মিত ছবির সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নকল ফটোকার্ডও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এবার বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসি ও সমমানের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্য বোর্ডে চলছিল। এরই মধ্যে ১৩ জুলাই প্রবল বর্ষণের কারণে বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। সেদিন পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল থাকায় তা নিয়েও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।

এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মুখে ‘ফার্মের মুরগি’র সঙ্গে তুলনা শুনে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে গতকাল মঙ্গলবার সড়কে বিক্ষোভে নামেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে একদল শিক্ষার্থী সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিলে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাঁদের হটিয়ে দেয়।

এই তথ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন আসছে; তার সঙ্গে এমন খবরও ছড়াচ্ছে, যার কোনো ভিত্তি নেই।

গলা চেপে ধরা নিয়ে ভুয়া দাবি

আন্দোলনের সময় একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থীর গলা চেপে ধরে হুমকি দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের এক নেতা। ভিডিওটির একটি মুহূর্ত এআই প্রযুক্তির সহায়তায় স্থিরচিত্রে রূপান্তর করে অসংখ্য পেজ ও প্রোফাইল থেকে ছড়ানো হচ্ছে।

ভিডিও লিংক: প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

ছবির লিংক: প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

যাচাইয়ে দেখা যায়, দাবিটি বিভ্রান্তিকর। কারণ, যাঁকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তিনিও ছাত্রদলেরই নেতা।

ছাত্রদল নেতাদের ভাষ্য, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দিকে তেড়ে গেলে ঢাকা মহানগর (পূর্ব) ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক মাহিন আহমেদ সুজনকে থামিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ওমর ফারুক মামুন। এটি সেই ঘটনার ভিডিও। ঘটনাটি আন্দোলনরত কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটেনি।

মাহিন আহমেদ সুজন নিজেই এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, আন্দোলনের মধ্যে কিছু ব্যক্তি সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করছিলেন এবং সেই পরিস্থিতির একটি অংশ কেটে বিকৃতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

লিংক: এখানে

একই বিষয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আমানউল্লাহ আমানও ফেসবুক পোস্টে বলেন, ছাত্রদলের একজন কর্মীকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিতর্কে জড়াতে নিষেধ করতেই একজন কেন্দ্রীয় নেতা তাঁকে নিবৃত্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।

লিংক: এখানে

ভাইরাল ভিডিওটি ২০২৪ সালের

আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের বক্তব্য দেওয়ার একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, অটো পাসের দাবিতে আন্দোলন করছে তারা।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। এটি ২০২৪ সালের আগস্টে সে বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়কার।

দেশ টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট একই ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্যাপশনের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় অটো পাসের দাবিতে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করছিলেন এইচএসসি শিক্ষার্থীরা।

লিংক: এখানে

পুরোনো ছবি ব্যবহার করে হামলার দাবি

‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ ও ছাত্রদল হামলা চালিয়েছে, বহু শিক্ষার্থী আহত’, এমন দাবিতে একটি ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি সাম্প্রতিক নয়। এটি ২০২৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের ছবি। অর্থাৎ পুরোনো একটি ঘটনার ছবি বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে বিভ্রান্তিকর দাবি করা হয়েছে।

লিংক: এখানে

গোপনে তুলে নিয়ে মারধর ও নিহত হওয়ার দাবি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও দাবি করা হয়, সায়েন্স ল্যাব এলাকায় শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে ছাত্রদল মারধর করছে। একই সঙ্গে দুজন, পাঁচজন কিংবা ঢাকায় সাত শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার দাবিতেও অসংখ্য পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।

কোলাজ : প্রথম আলো

যাচাইয়ে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমেও এ ধরনের ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হয়নি।

মন্ত্রীদের নামে ভুয়া বক্তব্য ও এআই পদত্যাগপত্র

আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির নামে একাধিক ভুয়া মন্তব্য–সংবলিত ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক

কোলাজ : প্রথম আলো

একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন দাবি করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি একটি ভুয়া পদত্যাগপত্রও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। যাচাইয়ে এসব দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

দৈনিক প্রথম আলোয় (১৪ জুলাই) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সংসদে তিনি আরও বলেছেন, উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা আবার নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।

লিংক: এখানে

হতাহত শিক্ষার্থীর ছবি এআই দিয়ে তৈরি

আন্দোলনের ‘প্রথম নিহত শিক্ষার্থী’ দাবি করে একটি এআই–নির্মিত ছবি প্রচার করা হয়। পরে একই ছবি ব্যবহার করে ‘ব্রেকিং নিউজ: এইচএসসি শিক্ষার্থী নিহতের সংখ্যা দাঁড়ালো পাঁচ’, এমন দাবিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও আবার ঢাকায় সাত শিক্ষার্থী নিহত হলেও গণমাধ্যম তা গোপন করছে, এমন দাবিও করা হয়।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি বাস্তব কোনো ঘটনার নয়। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি। একই সঙ্গে নিহত হওয়ার দাবিগুলোরও কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

প্রথম আলোর নামে ভুয়া ফটোকার্ড

১৪ জুলাই প্রথম আলোর নকশার আদলে তৈরি নকল দুটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়।

একটিতে দাবি করা হয়, ‘ফরিদপুরে আন্দোলনরত এইচএসসি ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছে এক শিক্ষার্থী।’

অন্যটিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়, ‘এরা কেউ সাধারণ শিক্ষার্থী নয়, এরা ফ্যাসিস্টের দোসর, দেশ অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে মাঠে নেমেছে।’

যাচাইয়ে দেখা গেছে, দুটি দাবিই সম্পূর্ণ মিথ্যা। ফরিদপুরে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এমন কোনো বক্তব্য দেননি।

প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সতর্কতামূলক পোস্টে জানিয়েছে, এমন কোনো ফটোকার্ড তারা প্রকাশ করেনি। এ দেখে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন।

যাচাই করে দেখা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথম আলোর ফটোকার্ডের নকশা নকল করে এগুলো তৈরি করা হয়েছে।