সংসদে অর্থমন্ত্রী
বিদেশ থেকে অর্থ ফেরাতে ৯ আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু
ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের অর্থ বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রথম ধাপে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম এবং শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন–সংশ্লিষ্ট ছয়টি মামলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযুক্ত ঋণখেলাপিদের বিদেশে থাকা অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত করে তা দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে আইনি সহায়তা দেবে। পরবর্তী সময়ে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেলা তিনটায় জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি এবং ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, ২০২৬ সালের মধ্যে শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল (এনএফআইএস) প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৭৮ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার
জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে কনসেশনাল ঋণ (নমনীয় শর্তের ঋণ) ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং নন-কনসেশনাল ঋণ (কঠিন শর্তের ঋণ) ৩৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।
রাজস্বদাতার সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৩৮ লাখ
ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে নিবন্ধিত রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
১৪ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ
গাইবান্ধা-৪ আসনের মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩১ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
তারল্যসংকটে ব্যাংকগুলোকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা
সংরক্ষিত আসনের সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থসংকটে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে না পারা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত জরুরি তারল্যসহায়তা দিচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, গত ১৫ জুন পর্যন্ত জরুরি তারল্যসহায়তা হিসেবে ৭৫ হাজার ৯০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
দেশে ৬৩টি ব্যাংকের ১১ হাজারের বেশি শাখা
সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ৬৩টি ব্যাংক ১১ হাজার ৩২৬টি শাখা এবং ৪ হাজার ৯২৯টি উপশাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্জন
সংরক্ষিত আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।
একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যা বললেন অর্থমন্ত্রী
সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের পৃথক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে ব্যাংক রেজোল্যুশন স্কিম-২০২৫-এর আওতায় আনা হয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে এবং আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী প্রত্যেক গ্রাহককে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আরও যেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে। প্রয়োজন হলে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ইতিমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
মুদির দোকানও আসবে ভ্যাটের আওতায়
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মুদির দোকান, বিউটি পারলারসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক ও কাপড়ের বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিকসের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্যের বিক্রেতা, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলস, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্ট, ফার্নিচার, মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং রেস্টুরেন্ট।
মন্ত্রী আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।