ইলিশের উৎপাদন কমছে চার কারণে, ভরা মৌসুমেও দাম চড়া
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের নিচতলার মাছের বাজার। বাজারের পাঁচটি দোকানে বিক্রেতারা ইলিশ নিয়ে বসে ছিলেন ক্রেতার অপেক্ষায়। ইলিশ কিনতে দরদাম করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আলতাফ হোসেন। তিনি বলছিলেন, ‘এ বছর দ্বিতীয়বারের জন্য ইলিশ কিনতে আসছি। ভাবছিলাম এক কেজি ওজনের কিনব। ২৪০০ টাকা করে চাইতেছে। গতবার ১৮০০ টাকা দরে কিনছি। কী হইলো এবার!’
মাছ ব্যবসায়ী শুক্কুর আলীর দোকান থেকে দুটি ৭৫০ গ্রাম ওজনের মাছ নিলেন আলতাফ হোসেন। এক কেজির ইলিশ কিনতে পারলেন না, কারণ ‘বাজেট নেই’। শুক্কুর আলীর দোকানে দুটি ঝাঁকায় আড়াই শ গ্রামের ইলিশ। তিনি বলেন, ‘এইবার এ ধরনের ইলিশের চাহিদা বেশি। ইলিশের দাম আর কুনুদিন কমত না। সব ধরনের ইলিশ এবার চাইর শ থাইক্যা পাঁচ শ ট্যাকা বেশি গেলবারের চাইতে।’ তিনি মাছের ব্যবসা করছেন ২০ বছর ধরে। ইলিশের এমন দাম আগে দেখেননি।
এবার তিনি ১ কেজির ইলিশ ২ হাজার ২০০–এর নিচে বেচেননি। গতকাল ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন বলে জানান।
ইলিশের এমন চড়া দামের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন বা আহরণ কমছে। এ পরিস্থিতি গবেষকদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। এত কম উৎপাদনের কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন খ্যাতনামা ইলিশ–গবেষক মো. আনিছুর রহমান। তাঁর কথা, ‘দুই বছর ধরে যা দেখছি, তা বিপজ্জনক। মানুষ এবং প্রকৃতি, দুই–ই এর জন্য দায়ী।’
সাগরে অতিসূক্ষ্ম ক্ষুদ্র ফাঁসের জালের বিস্তার, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, দূষণ ও ডুবোচর উৎপাদন কম হওয়ার কারণ বলে আপাতত ধারণা করছেন গবেষকেরা।
এ বছর দ্বিতীয়বারের জন্য ইলিশ কিনতে আসছি। ভাবছিলাম এক কেজি ওজনের কিনব। ২৪০০ টাকা করে চাইতেছে। গতবার ১৮০০ টাকা দরে কিনছি। কী হইলো এবার!বেসরকারি চাকরিজীবী আলতাফ হোসেন
‘গাঙে মাছ নাই’
ইলিশের রাজধানীখ্যাত চাঁদপুরের মাছের আড়ত জুলাই মাস থেকেই জমজমাট থাকত। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আবদুল বারী জমাদার বলেন, তিন বছর আগেও জুলাই মাসের পর থেকে গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার মণ ইলিশ থাকত এ আড়তে। এবার গড়ে আড়াই শ মণের বেশি ইলিশ এক দিনে পাওয়া যায়নি। গতবারও গড়ে চার শ মণের মতো ইলিশ থাকত। ৩০ বছর ধরে এ পেশায় আছেন তিনি। এমন কম ইলিশ আর কখনো দেখেননি।
এই ইলিশ ব্যবসায়ী মনে করেন, ইলিশের বিচরণস্থলে দূষণ, ডুবোচর আর সাগরে অতি ছোট ফাঁসের জালের বিস্তারে ইলিশ কমছে। বেহুন্দি নামে এ ধরনের জাল নিষিদ্ধ।
দেশের ইলিশের বড় আড়ত পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। এখানকার মাছ ব্যবসায়ী ফজলু গাজী দুই যুগের বেশি সময় ধরে মাছ ব্যবসা করছেন। চারটি ট্রলারের মালিক তিনি। এই বন্দর থেকে মূলত সাগরের ইলিশই বেশি ধরা হয়। খুব কম ট্রলারই ২০ থেকে ৩০ মণের বেশি মাছ আনতে পেরেছে সাগর থেকে। গত বছর বেশির ভাগ ট্রলার ২০–৩০ এবং ৪০ মণ মাছ আনতে পারত বলে জানান এই ব্যবসায়ী। এবার এর পাশাপাশি বড় সমস্যা ছিল, সাগরে একের পর এক আবহাওয়ার সতর্কসংকেত। তাঁর মতে, ইলিশ কম পাওয়ার বড় কারণ, ‘গাঙে মাছ নাই। মাছ না থাকলে পাওয়া যাইবে কোত্থেকে?’
এত দ্রুত যে ইলিশ উৎপাদনের হার কমতে শুরু করবে ভাবিনি। এখন এ নিয়ে জরুরি গবেষণা দরকার।আনিছুর রহমান, ইলিশ–গবেষক
‘দাম শুইন্যা মানুষ দূরে চইল্যা যায়’
উচ্চমূল্যের কারণে ইলিশ এবার বিক্রিও কম হচ্ছে। আর বড় মাছের তুলনায় ছোট আকারের ইলিশের চাহিদাও বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে আরেক ব্যবসায়ী সরাফত আলী ইলিশ নিয়ে বসে ছিলেন ক্রেতার অপেক্ষায়। ১ কেজি, ১ কেজির বেশি, ৬০০ গ্রাম এবং ২৫০ গ্রামের ইলিশ তাঁর তিন ঝাঁকায়। তিনি বললেন, ‘এবার মাছ কম, কাস্টমারও কম। দাম শুইন্যা মানুষ দূরে চইল্যা যায়।’
সরাফত আলী জানান, ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের ইলিশের এবার চাহিদা অনেক বেশি। আগে এত ছোট ইলিশ এত বিক্রি করেননি। তিনি মনে করেন, দাম বেশি হওয়ায় কম ওজনের ইলিশ কিনে মানুষ চাহিদা মেটাচ্ছেন।
গত এক দশকের সরকারি ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইলিশের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে ২০২২ সালের পর মূল্যবৃদ্ধির গতি অনেক বেশি। আর ২০২৫ ও চলতি বছর সেই বৃদ্ধি অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশের গড় দাম ছিল ৫০৫ টাকা। বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ১ কেজি ওজনের ইলিশ সাধারণত ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হতো। ২০২৩ সালে এর দাম হয় ১ হাজার ২০০ টাকা।
সরাফত আলী জানান, ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের ইলিশের এবার চাহিদা অনেক বেশি। আগে এত ছোট ইলিশ এত বিক্রি করেননি। তিনি মনে করেন, দাম বেশি হওয়ায় কম ওজনের ইলিশ কিনে মানুষ চাহিদা মেটাচ্ছেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৮ সালে সব আকার মিলিয়ে প্রতি কেজি ইলিশের বার্ষিক গড় খুচরা মূল্য ছিল ৭০৫ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২২ সালে ইলিশের গড় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৯৫ টাকা ৯০ পয়সা। ২০২৪ সালে গড় দাম আরও বেড়ে ১ হাজার ১৬৮ টাকা ৫৬ পয়সায় ওঠে।
এই হিসাবে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল—চার বছরে ইলিশের বার্ষিক গড় দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে বার্ষিক গড়ের মধ্যে ছোট-বড় সব ধরনের ইলিশ থাকায় বাজারে ১ কেজি ওজনের ভালো ইলিশের দাম এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
২০২৪ সালে ইলিশের দাম আরও এক দফা বাড়ে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, ওই বছরের এক থেকে দেড় কেজি ওজনের মাছ বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ৭৫০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রামের দাম ছিল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
২০২৫ সালের আগস্টে একই সমীক্ষায় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ধরা পড়ে। এক–দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। ৭৫০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম হয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রামের মাছের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।
বেহুন্দি জালের অতি ব্যবহার, অতি আহরণ, ডুবোচরের প্রাধান্য—সর্বোপরি দূষণের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু এ জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করে উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে।
‘গোলাঘর নষ্ট হচ্ছে’
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ৯৫ টন ইলিশ উৎপাদন হয়। তবে এর পর থেকে প্রতিবছরই এর পরিমাণ বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড উৎপাদন হয়—৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন। তবে এরপর টানা দুই বছর ইলিশ উৎপাদন কমেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। আর ১২ শতাংশের মতো কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে তা দাঁড়ায় পাঁচ লাখ টনে।
এবার কত উৎপাদন হয়েছে তার হিসাব হবে আরও পরে। কিন্তু এর পরিমাণ গত বছরের থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
বাংলাদেশের ইলিশ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে আনিছুর রহমানের। এবার এত কম ইলিশ আহরণ এবং অতিরিক্ত দাম তাঁর কাছে বিস্ময়কর। তাঁর ভাষায়, ‘এত দ্রুত যে ইলিশ উৎপাদনের হার কমতে শুরু করবে ভাবিনি। এখন এ নিয়ে জরুরি গবেষণা দরকার।’ তিনি বলেন, বেহুন্দি জালের অতি ব্যবহার, অতি আহরণ, ডুবোচরের প্রাধান্য—সর্বোপরি দূষণের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু এ জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করে উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে।
এমন জায়গায় জাল পাতা আছে, যেটা একটা মুখের মতো। সেই মুখে যদি এত বড় জালের বিস্তার থাকে, তাহলে ইলিশের বিচরণ কীভাবে হবে?চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ
ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে অতিসূক্ষ্ম জাল ব্যবহার করে অতি আহরণকে একটি বড় কারণ বলে ধরা হচ্ছে। ইলিশের বর্তমান অবস্থা বুঝতে চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একাধিক দল দেশে ইলিশের বিচরণস্থানে কাজ শুরু করেছে। একটি দল সম্প্রতি হাতিয়ায় গিয়ে মোহনার মুখে বিশাল এলাকাজুড়ে বেহুন্দি জালের বিস্তার দেখেছে।
ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এমন জায়গায় জাল পাতা আছে, যেটা একটা মুখের মতো। সেই মুখে যদি এত বড় জালের বিস্তার থাকে, তাহলে ইলিশের বিচরণ কীভাবে হবে?
এবার ইলিশের উৎপাদন কমে যে গেছে তা অনুমানের ওপর নির্ভর করে অনেকেই বলছেন। কিন্তু তায়েফা আহমেদ বাস্তব উদাহরণ দিলেন। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, এ বছর যেসব ইলিশ ধরা পড়ছে, তার মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশের পেটে ডিম আছে। দু–তিন বছর আগেও এর পরিমাণ ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এর অর্থ হলো, বড় ইলিশের সংখ্যা কমছে।
বড় ইলিশ কম ধরা পড়া সার্বিকভাবে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করেন আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমুদ্র ইলিশের গোলাঘর। সেই গোলাঘর নষ্ট হচ্ছে, এটা বলাই যায়।’