অতিদ্রুত মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হবে: সংসদে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী

জাতীয় সংসদ ভবনফাইল ছবি

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ দ্রুত সুগম হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের পর বাংলাদেশি কর্মীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। দেশটির শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত করতে সরকার কাজ করছে। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারদলীয় সংসদ সমস্য খোন্দকার আবু আশফাকের প্রশ্নের লিখিত জবাবে বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এ কথা বলেন। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রশ্নের উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।

আজ সোমবার বেলা তিনটায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিদেশে নামমাত্র কোম্পানি খুলে ভুয়া চাহিদাপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি, রাশিয়ায় কাজের প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ, প্রবাসীদের জামানতবিহীন ঋণের সীমা বাড়ানো, প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে।

সরকারদলীয় সদস্য খোন্দকার আবু আশফাকের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এ বছরের ৮-১১ এপ্রিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী দেশটি সফর করেছেন। আশা করা যায়, দ্রুত দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের পথ সুগম হবে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো বন্ধ বা সংকুচিত শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, সেশেলস, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হচ্ছে। কর্মী প্রেরণের বিষয়ে বিশ্বের ১৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

বিএনপির সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানান, বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ জন বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।

ভুয়া চাহিদাপত্রে কর্মী নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে

বিদেশে নামমাত্র কোম্পানি খুলে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নুরুল হক।

নোয়াখালী-৬ আসনের সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশিরা অথবা ওই দেশের মালিকপক্ষের সঙ্গে মিলে নামমাত্র কোম্পানি খুলে এখান থেকে লোক নিয়ে যাচ্ছে। দেখা যায় ১০ জনের কাজের জায়গায় ১০০ জন নিয়ে যাচ্ছে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশ থেকে পাঠানো ডিমান্ড লেটার সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস সত্যায়ন করে। তাই দূতাবাস পর্যায়ে আরও কঠোর নজরদারি, মনিটরিং ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। তিনি জানান, বর্তমানে ২৭টি দেশে বাংলাদেশের ৩০টি শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে। তবে জনবল ও আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে এবং মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিনা সুদে ঋণ নয়, ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা

ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসানের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য বর্তমানে জামানতবিহীন তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ ৮ শতাংশ সুদে দেওয়া হচ্ছে। এই ঋণের সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে বিনা সুদে ঋণ চালুর কোনো সরকারি পরিকল্পনা বর্তমানে নেই।

রাশিয়ায় কাজের কথা বলে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ

সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, রাশিয়ায় কাজের সুযোগের কথা বলে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘রাশিয়াতে ৩০ জন কর্মীকে কাজের কথা বলে তাঁদের যুদ্ধে সম্পৃক্ত করেছে। তাঁদের পরিবার আমাদের জানিয়েছে।’

এ ঘটনায় জড়িত তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ইনস্ট্যান্ট তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বন্ধ করে দিয়েছি।’ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার প্রক্রিয়াও চলমান। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানো অনেক বাংলাদেশি তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে সেখানে গেছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রবাসীদের লাশ ফেরানোর ব্যয় বহন করে সরকার

কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিলম্বের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে প্রতিমন্ত্রী জানান, বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে মরদেহ দেশে আনার পুরো ব্যয় সরকার বহন করে। তিনি বলেন, অনথিভুক্ত (আনডকুমেন্টেড) কর্মীদের ক্ষেত্রেও মানবিক বিবেচনায় সহায়তা দেওয়া হয়। দুর্ঘটনায় আহত বা পঙ্গুত্ববরণকারী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জুলাই আন্দোলনে প্রবাসীদের অবদানের স্বীকৃতি

গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বিদেশে অবস্থান করে যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিলেন, সরকার তাঁদের অবদান স্মরণ করে। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ প্রবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং কয়েকজনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। বাকি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

নারী শ্রমিকদের জন্য হটলাইন ও সেফ হোম

সংরক্ষিত নারী আসনের জামায়াতের সদস্য সদস্য মারদিয়া মমতাজের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সহায়তায় ১৬১৩৫ নম্বরে টোল ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। দেশের বাইরে থেকেও প্রবাসীরা এই সেবার মাধ্যমে অভিযোগ বা সমস্যার কথা জানাতে পারেন।

তিনি জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশের দুটি সেফ হোম রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে পর্যায়ক্রমে সেফ হোম পরিচালনা করা হচ্ছে।

নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে এখন আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম মান এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো নিশ্চিত করার পরই বিদেশে নারী কর্মী পাঠানো হচ্ছে।