সিজিপিএ কখনোই যোগ্যতা মাপার প্রধান উপায় হতে পারে না: সালেহিন মুশফিক সাদাফ

পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’-এর প্রথম পর্বে অতিথি ছিলেন জিপিএইচ ইস্পাতের পরিচালক (কৌশল ও রূপান্তর) সালেহিন মুশফিক সাদাফছবি: প্রথম আলো
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় প্রথম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন জিপিএইচ ইস্পাতের পরিচালক (কৌশল ও রূপান্তর) সালেহিন মুশফিক সাদাফ। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ইস্পাতশিল্পে সঠিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ’।

‘ভালো সিজিপিএ একটা ইঙ্গিত দেয় যে ছেলে বা মেয়েটি হয়তো বেশ সুশৃঙ্খল এবং তার জীবনে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য আছে। তবে সিজিপিএ কখনোই একজন মানুষের যোগ্যতা মাপার প্রধান উপায় হতে পারে না।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন সালেহিন মুশফিক সাদাফ। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় ১১ জানুয়ারি প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোয়।

পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, ‘ফ্যাক্টরি নাকি বোর্ড মিটিং, কোনটা আপনার বেশি পছন্দ?’

উত্তরে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, বোর্ড মিটিং। কারণ, মিটিংয়ে বসেই পুরো ব্যবসার ওপর নজর রাখা যায় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা যায়। ফ্যাক্টরিতে মূলত নতুন প্রজেক্ট শুরুর সময় বেশি কাজ থাকে। প্রজেক্ট দাঁড়িয়ে গেলে অফিস থেকেই কার্যকরভাবে সব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

‘অনেক কোম্পানি-মালিক তাঁদের সন্তানদের সরাসরি পরিচালক বানিয়ে দেন। আবার অনেকে মনে করেন, বোর্ডের সদস্য হওয়ার আগে ফ্যাক্টরি থেকে কাজ শেখা উচিত। আপনার মতামত কী?’

এমন প্রশ্নের উত্তরে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘অভিজ্ঞতা অর্জন করেই দায়িত্বশীল চেয়ারে বসাটা খুবই জরুরি। আমি বিদেশ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেও সরাসরি বোর্ডে বসিনি। টানা দুই বছর চট্টগ্রামে ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছি, প্ল্যান্ট তৈরির তদারক করেছি, এমনকি বন্দরে গিয়ে জাহাজে উঠেও নানাবিধ দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে এখন রিপোর্ট দেখলেই বুঝতে পারি কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। ফ্যাক্টরির কাজ মানে শুধু মেশিন নয়, মানুষ, পরিবেশ আর বাস্তব সমস্যা বোঝা। এটা বোর্ডে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সাহায্য করে।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘যেহেতু এটা আপনাদের পারিবারিক ব্যবসা, আপনার ভাইবোন বা কাজিনদের কেউ কি ব্যবসায় যুক্ত?’

উত্তরে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার বড় বোন সাদমান সাইকা শেফা চট্টগ্রামে আমাদের ব্যবসার ইন্টারনাল অডিট ও অ্যাকাউন্টস দেখছেন। আমার চাচাতো ভাই আলী মোহাম্মদ সাদী সাজ্জাদ লোকাল প্রকিউরমেন্টের দায়িত্বে আছেন। আরেক কাজিন সায়হাম সাদিক পিয়ালও সম্প্রতি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ‘অফিসে কি সবাই একসঙ্গে লাঞ্চ করেন?’

সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘হ্যাঁ, যদিও আমাদের একেকজনকে একেক জায়গায় মানে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা ফ্যাক্টরিতে থাকতে হয়, তবু যদি কখনো সময় ও সুযোগ মেলে, সবাই একসঙ্গেই লাঞ্চ করি।’

অফিসে যখন সবাই একত্র হয়, তখন বাসার কথা আর বাসায় একত্র হলে পারিবারিক কথাবার্তা কি হয়?

সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘সাধারণত না। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, বাবা-চাচারা অফিসের বিষয় বাসায় এবং বাসার বিষয় অফিসে আনতেন না। এই চর্চা আমাদের পরিবারে এখনো আছে।’

অনেক উদাহরণ আছে, বাংলাদেশে পারিবারিক ব্যবসা শুরুর দিকে ভালো করলেও পরবর্তীকালে সেই ধারাবাহিকতা অটুট থাকে না। বিষয়টি উল্লেখ করে সঞ্চালক বলেন, ‘সেকেন্ড জেনারেশন বা দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসেবে আপনার কী মনে হয়, একটি পারিবারিক ব্যবসাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত?’

এ প্রসঙ্গে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আর সাকসেশন প্ল্যানিং—এই দুটো না থাকলে আস্থার সংকট তৈরি হয়। তাই আমরা এখন থেকেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পনা করছি, পরস্পরের কথা শুনছি, চিন্তাভাবনা বোঝার চেষ্টা করছি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে কাজ করছি। এভাবে কাজ করলে আমার মনে হয় পারিবারিক ব্যবসার পরিধি বাড়বে এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকবে।’

‘এখনকার তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকটা সময় কাটান, কিন্তু আমি জানি, আপনি ড্যাশবোর্ডে কাজের আপডেট দেখতেই বেশি পছন্দ করেন। কাজের এই চাপ বা গুরুত্বকে আপনি কীভাবে উপভোগ করেন?’

জবাবে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘আমি কাজটা সত্যিই ভালোবাসি। শুরুতে যখন শেখার পর্যায়ে ছিলাম, তখন আমার ওপর নেতৃত্বের কোনো চাপ ছিল না। কিন্তু মাস্টার্স শেষ করে আসার পর যখন বড় দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়ল এবং দিন শেষে আমাকে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে হলো, তখন কাজের ধরন বদলে গেল। এখন টিমের ওপর ভরসা করে দায়িত্ব ভাগ করে দিই। সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে ভালো ফল পেলে সেটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

সঞ্চালক এ পর্যায়ে বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের অনেক ব্যবসায়ী হয়তো শর্টকাট রাস্তা খোঁজেন। কিন্তু ভালোভাবে কাজ শেখার জন্য বাবা-চাচার বাইরে আর কী কী মাধ্যম বা উপায় আছে বলে আপনি মনে করেন?’

উত্তরে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘শেখার কোনো শেষ নেই। পরিবার, সহকর্মী ও সমাজ—সব জায়গা থেকেই শেখা যায়। বিশেষ করে অফিসের ভেতরে বা বাইরে—প্রত্যেক মানুষের জীবন ও তাঁদের পথচলার গল্প থেকে কিছু না কিছু শেখার আছে, যা আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।’

‘কর্মী নিয়োগের সময় প্রার্থীর ডিগ্রি না দক্ষতা, কোনটাতে বেশি গুরুত্ব দেন? জানতে চাই।’

সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘দুটোতেই সমান গুরুত্ব দিই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কারও শিক্ষাগত বা পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান এক নয়। তাই নিয়োগের সময় আমরা দক্ষতা যেমন দেখি, তেমনি তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশও বিবেচনায় রাখি।’

এ কথার সূত্র ধরে সঞ্চালক জানতে চান, সিজিপিএ নাকি সামাজিক দক্ষতা?

সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি যখন কোনো ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকি, তখন প্রার্থী কতটা স্মার্ট, তাঁর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক দক্ষতাগুলো কেমন, এসব বিবেচনায় রাখি। এ ছাড়া অফিসের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে তিনি নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, সেটাও যাচাই করে নিই।’

‘আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটা?’

জানতে চাইলে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘চট্টগ্রামে একা গিয়ে দুই বছর কাজ করার সময়টা। পরিবার ও বন্ধুদের ছাড়া নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া মানসিকভাবে খুব কঠিন ছিল। তখন নিয়মিত প্রার্থনা, হাঁটাহাঁটি আর খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেকে সামলে নিয়েছি।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘কাজের সঙ্গে কাজের সমন্বয় নাকি কাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য, আপনার কাছে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ?’

জবাবে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘মাঝেমধ্যে বিরতি খুব দরকার। আমি দেখেছি, যখন টানা একই কাজ করা হয়, তখন সবকিছু একঘেয়ে হয়ে যায়। তাই আমি যখন চার-পাঁচ দিনের জন্য দেশের ভেতরে বা বাইরে কোথাও ঘুরতে যাই, তখন মনটা সতেজ হয়। নতুন আইডিয়া আসে। নতুন উদ্যম নিয়ে কাজ শুরু করতে পারি।’

আড্ডার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক বলেন, ‘ভবিষ্যতে আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান?’

উত্তরে সালেহিন মুশফিক সাদাফ বলেন, ‘পরিবার ও ব্যবসায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। সময় ও ভবিষ্যৎই বলে দেবে, আমি আসলে কোন অবস্থানে পৌঁছাব। তবে আমাদের জিপিএইচ ইম্পাত, ক্রাউন সিমেন্ট বা প্রিমিয়ার সিমেন্ট–কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, আমাদের পারিবারিক বন্ধন ও একতা। এই একতাই আমাদের কোম্পানিকে ভবিষ্যতে আরও দূরে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করি।’