হাওরের ফসলহানি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে। এটি যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়।
আজ রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বক্তারা। ঢাকায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক উদ্যোগের যৌথ আয়োজনে ‘হাওর অঞ্চলে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানি, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং হাওরবাসীর দাবি’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন পরিবেশ ও হাওর গবেষকেরা।
লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে। এটি যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। এই ফসলহানির ফলে বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন সামাজিক সংকট দেখা দেবে। শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে। এসব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বর্গাচাষি মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের সহায়তা প্রদান করতে হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার নেই। যত দ্রুত স্থানীয় সরকার হবে, তত দ্রুত এলাকার জন্য এবং বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য ততই ভালো বলেন গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, ‘এবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থানীয় সরকার নেই। চেষ্টা করতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার যাতে তৈরি করা যায় এবং তারা যাতে এতে কাজ করতে পারে।’
সংবাদ সম্মেলনে আলোচক এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ফসলহানির কারণে কৃষকদের জীবিকা, ঋণ পরিশোধ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যাহত হবে। হাওরের এই সংকট শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। গবাদিপশুর খাদ্যসংকটও দেখা দিচ্ছে। এতে কৃষকেরা কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স) বলেন, হাওর রক্ষার নামে বছর বছর শতকোটি টাকার লোপাট হয়। এই অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে হাওরকে বাঁচানো যাবে না। হাওরের বাস্তুতন্ত্র বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা। তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা এখন চরম মানবিক সংকটে রয়েছেন। চলতি বোরো মৌসুমে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত টানা তিন দফা বৃষ্টিপাত এবং ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া শিলাবৃষ্টিতে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও বন্যা কৃষকদের আরও বড় ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারে।
সমস্যা সমাধানে তিনি ১৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বছরব্যাপী পরিবারপ্রতি ৩০ কেজি চাল ও এক হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান, নদী-খাল ও বিল খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।
এ ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর স্লুইসগেট নির্মাণ, হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে চাল নয়, অন্তত ১০ লাখ টন ধান সরাসরি ক্রয়, সুদমুক্ত ঋণ ও ঋণের পুনঃ তফসিল, কমিউনিটি মাড়াইকেন্দ্র ও ড্রায়ার স্থাপন, বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, জলমহালের লিজ বাতিল করা, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জলবায়ু তহবিল থেকে হাওরাঞ্চলে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, এবারের সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়, এটি একটি নীতিগত, পরিকল্পনাগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট। নদীর নাব্যতা কমানো, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, ফসল রক্ষা বাঁধ তৈরিতে দেরি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।
এ সময় আরও বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ সমিতি ঢাকার সাবেক সভাপতি ওমর খৈয়াম, হাওরাঞ্চলবাসী ঢাকার সমন্বয়ক হালিম দাদ খান প্রমুখ।