প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক
স্রোতের পানিতে আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করছে হাতি—ভিডিওটি নেপালের বন্যার নয়
পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত। পাড়ের কাছাকাছি বড় একটি পাথরখণ্ডের ওপর থাকা এক ব্যক্তি ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। পানির প্রবল স্রোত যেকোনো সময় তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পাশে থাকা লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে দেখা গেল, একটি হাতি পানির স্রোতের মধ্যে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে নিরাপদে সরিয়ে আনছে।
২০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ‘নেপালে বন্যার তীব্র স্রোতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করল বন্য হাতি।’ কোথাও কোথাও ভিডিওটিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময়ের বলেও প্রচার করা হয়েছে।
তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা নয়। ওই দুর্যোগের অন্তত ১৮ দিন আগেই একই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া গেছে। তবে ভিডিওটির প্রকৃত স্থান ও সময় অবশ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
নেপালের দাবি যেভাবে ছড়াল
‘নেপালে বন্যার তীব্র স্রোতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করল বন্য হাতি’ দাবিতে গত ২৭ আগস্ট ফেসবুকে ‘সংবাদ প্রতিদিন ২৪’ নামের একটি পেজে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে। এতে ৭ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়েছে।
লিংক: এখানে
একই দাবি বেশি ছড়ানোর মধ্যে ‘Gazi Babl’, ‘Sowrov Ahmed’ ও ‘David J Harris Jr.’-এর মতো ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ থেকেও ভিডিওটি নেপালের বন্যা ও ভূমিধসের দৃশ্য দাবি করে প্রচার করা হয়েছে। এসব পোস্টে ভিডিওটি ৫৬ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক
একইভাবে, এক্সে ‘নেপালে হাতিরা মানুষকে বাঁচাচ্ছিল’ ক্যাপশনে ‘Tony Gunk’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ওই পোস্টে ভিডিওটি ৮ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।
লিংক: এখানে
নেপালের বন্যার আগেই ভিডিও
দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমে ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। এতে ভারতীয় নিউজ পোর্টাল ‘বাংলা হান্ট’-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৮ আগস্ট থেকে একই ভিডিওর একটি সংস্করণ পাওয়া যায়; অর্থাৎ নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ২৬ আগস্টের বন্যা ও ভূমিধসের ১৮ দিন আগে থেকেই ভিডিওটি অনলাইনে ছিল। ওই সময়ের একাধিক পোস্টে ভিডিওটিকে বিভিন্ন ক্যাপশনে প্রচার করা হয়েছে। কোথাও এটিকে আসামের বন্যার দৃশ্য হিসেবে দাবি করা হয়েছে, আবার কোথাও শুধু হাতির সাহায্যে একজন মানুষকে উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক
পরে পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’-এর ফেসবুক পেজ এবং বাংলাদেশের ‘নাগরিক প্রতিদিন’-এর ইউটিউব চ্যানেলেও ৯ আগস্ট একই ঘটনার আরও দীর্ঘ ভিডিও পাওয়া যায়। এসব ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে নেপালের বন্যার দাবি করে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে।
লিংক: এখানে
‘এই সময়’-এর ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘তুমুল জলস্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষকে উদ্ধার করল হাতি।’ তবে ভিডিওটির ওপর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে গণমাধ্যমটি ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেনি।
অন্যদিকে ‘নাগরিক প্রতিদিন’ তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিওটি ‘বন্যার মাঝে মালিককে বাঁচালো পোষা হাতি’ ক্যাপশনে প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, ভয়াবহ বন্যার পানিতে বিপদে পড়া এক ব্যক্তিকে তাঁর পোষা হাতি উদ্ধার করেছে।
লিংক: এখানে
আসামের বন্যার দাবিও আছে
৮ ও ৯ আগস্ট ভারত থেকে পরিচালিত ‘দ্য ওয়্যার ইন্ডিয়া’ ও ‘সঞ্জয় পেরা নিউজ’-এর ফেসবুক পেজ থেকেও একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। এসব পোস্টে ঘটনাস্থল হিসেবে সরাসরি ‘আসাম’ উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আসামের বন্যায় হাতির সাহায্যে বাঁচলো মানুষ’। পোস্টে ‘Assam Floods’ হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করা হয়।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে আসামে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ ওই বন্যায় মৃত মানুষের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায় এবং প্রায় তিন লাখ মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেয়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
লিংক: এখানে
তবে ভিডিওটি আসামের বন্যারই ঘটনা কি না, সেটি নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য, যাচাইয়ে পাওয়া যায়নি।
ভিডিওটি কি এআই-নির্মিত?
ভিডিওটির দৃশ্য পর্যালোচনা করলে কিছু অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। বিশেষ করে, ব্যক্তি যেভাবে হাতিটির শুঁড় বেয়ে ওপরে উঠছেন এবং পরে হাতিটির ঘাড় দিয়ে নিচে নামছেন, সেখানে শরীরের ভঙ্গি ও নড়াচড়ার ধারাবাহিকতা কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়।
ভিডিওটি এআইয়ের সহায়তায় তৈরি কি না, তা যাচাই করতে Hive Moderation-এর এআই শনাক্তকরণ টুলে পরীক্ষা করা হয়। টুলটি ভিডিওটিকে এআই-নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ দেখিয়েছে।
শুধু এআই শনাক্তকারী টুলের ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো ভিডিওকে এআই-নির্মিত বলে নিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না; বরং ভিডিওটির উৎস ও প্রকৃত ঘটনাস্থল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়া এবং ভিডিওটি প্রচারের সময়ই নেপালের দাবিটি মিথ্যা প্রমাণের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই ভিডিও, বদলে গেছে প্রেক্ষাপট
ভিডিওটির প্রচারের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একই দৃশ্য ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।
৮–৯ আগস্ট: ভিডিওটি ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাপশনে ছড়ায়। কোথাও এটিকে আসামের বন্যার দৃশ্য বলা হয়, আবার কোথাও শুধু হাতির সাহায্যে মানুষ উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
২৬ আগস্ট: নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
২৭ আগস্ট: এর আগে থেকেই অনলাইনে থাকা একই ভিডিও নতুন করে ‘নেপালের বন্যায় হাতি মানুষকে উদ্ধার করেছে’ দাবিতে ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থাৎ নতুন একটি দুর্যোগের সঙ্গে পুরোনো ভিডিওকে যুক্ত করে প্রচারের মাধ্যমে ভিডিওটির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করা হয়েছে।
নেপালের বন্যার সঙ্গে সম্পর্ক নেই
হাতির সাহায্যে একজন মানুষকে উদ্ধারের এই ভিডিও অন্তত ৮ আগস্ট থেকেই অনলাইনে প্রচারিত হয়ে আসছে। পরে ভারতীয় কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ ও অ্যাকাউন্টে এটিকে আসামের বন্যার দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হলেও ভিডিওটির প্রকৃত স্থান ও সময় নিশ্চিত করা যায়নি।
তবে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ২৬ আগস্টের বন্যা ও ভূমিধসের আগেই একই ভিডিও অনলাইনে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের দৃশ্য নয়।
নেপালের বন্যা ঘিরে আরও ভিডিও
নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও কয়েকটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ভিডিওর কোনোটিকে ভারতের উত্তরাখন্ড, আবার কোনোটিকে জম্মু-কাশ্মীরের পুরোনো দুর্যোগের দৃশ্য হলেও নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
উত্তরাখন্ডের পুরোনো ভিডিও
সম্প্রতি ফেসবুকে পাহাড়ি ঢলের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তীব্র পানির স্রোতের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীদের ‘ভাগো, ভাগো’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, এটি নেপালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক বন্যার দৃশ্য।
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি নেপালের নয়। এটি ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের উত্তরকাশী জেলায় ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া আকস্মিক বন্যার দৃশ্য।
ভিডিওটির উৎস খুঁজে পেতে কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। এই ঘটনায় ওই সময় একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল।
জম্মু-কাশ্মীরের ভিডিও নেপালের দাবি
আরেকটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, ‘নেপালে ভয়াবহ বন্যা, চোখের পলকে মানুষসহ তলিয়ে গেল পুরো ভবন’ এমন ক্যাপশনে।
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার নয়। এটি চলতি বছরের জুলাইয়ে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া একটি দুর্যোগের দৃশ্য।
ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ভারতীয় একাধিক সংবাদমাধ্যম একই ঘটনার ভিডিও ও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। যার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপালের বন্যার দাবি করে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে।