একটি স্থবির ও নেতিবাচক ধারণা আমাদের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে জেঁকে ছিল— ক্যানসার মানেই অবধারিত মৃত্যু। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের ফলে এ ধারণা এখন বদলে গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের পর দ্বিতীয় প্রধান ক্যানসার হলো হেড-নেক ক্যানসার। তবে আশার কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন এবং সচেতনতার মাধ্যমেই এ ভয়াবহ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার আধুনিকায়নই এখন এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রধান অস্ত্র।
১৬ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) এসকেএফ অনকোলজির বিশেষ আয়োজন ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনায় এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম। বিশ্ব ক্যানসার দিবস ও ‘মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার সচেতনতা মাস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নাসিহা তাহসিন। আলোচনায় অধ্যাপক রওশন আরা ক্যানসার প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় এবং আধুনিক চিকিৎসার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। অনুষ্ঠানটি প্রথম আলো এবং এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।
মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের ব্যপ্তি আসলে শরীরের কতটুকু অংশ জুড়ে, সে বিষয়ে অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করেন। তাঁর মতে, আমাদের মুখগহ্বর থেকে শুরু করে কণ্ঠনালি, জিব, লালাগ্রন্থি, থাইরয়েড এমনকি নাকের পেছনের অংশ পর্যন্ত যেকোনো স্থানে ক্যানসার হানা দিতে পারে। আমাদের দেশের তামাক ব্যবহারের অভ্যাসটি এতটাই সহজলভ্য যে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও এই ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকে। যদিও আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষদের হার তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে পানের সঙ্গে জর্দা, চুন কিংবা সাদা পাতা ব্যবহারের মতো তামাকজাত দ্রব্যের সহজলভ্যতা এই রোগের হারকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তামাকের পাশাপাশি অতিরিক্ত মদ্যপান এবং বর্তমান সময়ে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) সংক্রমণও এই ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়া ওরাল হাইজিন বা মুখের পরিচ্ছন্নতায় অবহেলা এবং ভাঙা দাঁত কিংবা কৃত্রিম দাঁতের দীর্ঘস্থায়ী ঘর্ষণ থেকেও ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি দানা বাঁধতে পারে।
অনেকের মনে একটি প্রশ্ন থাকে, ক্যানসার কি বংশানুক্রমিক বা জেনেটিক কিনা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, এটি সরাসরি ব্রেস্ট বা ওভারিয়ান ক্যানসারের মতো জেনেটিক না হলেও পারিবারিক জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি কোনো পরিবারে তামাক বা জর্দা ব্যবহারের ঐতিহ্য থাকে, তবে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সেই অভ্যাসের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়। একে সরাসরি জেনেটিক বলার চেয়ে পরিবেশগত ও লাইফস্টাইলগত ঝুঁকি বলাই বেশি যৌক্তিক। এছাড়া কাঠ বা কাঠের ধুলিকণা সরাসরি নাকে যায় এমন কারখানায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরও নির্দিষ্ট কিছু হেড-নেক ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই পারিবারিক অভ্যাস বদলানোই প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায়।
মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে শরীর খুব নির্দিষ্ট কিছু সংকেত প্রদান করে। অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগমের মতে, মুখের ভেতরে এমন কোনো ক্ষত যা অন্তত তিন সপ্তাহ পার হওয়ার পরেও সাধারণ চিকিৎসায় না নিরাময় হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা জরুরি। অনেক সময় ঘাড়ের এক পাশে বা দুই পাশে কোনো মাংসপিণ্ড বা চাকা দেখা দিলে তাকে সাধারণ ঠান্ডা লাগার সমস্যা ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। এর বাইরে কণ্ঠস্বরে আকস্মিক ভারী ভাব আসা কিংবা খাবার গিলতে সমস্যা হওয়া হতে পারে বড় কোনো বিপদের লক্ষণ। কারণ ছাড়াই কানে অনবরত ব্যথা হওয়া অথবা নাক ও মাড়ি দিয়ে নিয়মিত রক্তক্ষরণও বিপদের সংকেত দেয়। অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, ক্যানসার পুরোপুরি হওয়ার আগেই অনেক সময় মুখে লালচে বা সাদাটে স্পট দেখা দেয়, যা আয়নায় দেখে নিজেই শনাক্ত করা সম্ভব। যেহেতু প্রথম ধাপেই রোগটি ধরা পড়লে নিরাময়ের হার প্রায় শতভাগ থাকে, তাই যেকোনো অস্বাভাবিকতা টের পেলে দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ বা ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এই ক্যানসারের সঠিক চিকিৎসার ধাপগুলো সম্পর্কে জানতে চান উপস্থাপক। উত্তরে ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, প্রথম ধাপ হলো নির্ভুল রোগ নির্ণয়। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর বায়োপসি করা অত্যন্ত জরুরি, যা ক্যানসার নিশ্চিত করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, বায়োপসি করলে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বায়োপসি রিপোর্ট পাওয়ার পর সিটি স্ক্যান, এমআরআই কিংবা শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়েছে কি না তা দেখার জন্য পেট-সিটি স্ক্যান করা হয়। এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে ক্যানসারের পর্যায় বা ‘স্টেজিং’ নির্ধারণ করা হয়। স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা ভিন্ন হয়—যেমন আর্লি স্টেজে কেবল সার্জারি বা রেডিয়েশনেই রোগী সুস্থ হতে পারেন কিন্তু জটিল পর্যায়ে একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
মাথা ও ঘাড়ের অংশে কথা বলা বা স্বাদ গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ থাকে। এ বিষয়ে ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, বর্তমানে অঙ্গহানি ছাড়াই ক্যানসার নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে রেডিয়েশন থেরাপি এখন অনেক বেশি নিখুঁত। আইএমআরটি, ভিম্যাট এবং থ্রিডি-সিআরটির মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে কেবল আক্রান্ত কোষেই রেডিয়েশন দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সার্জারির পর রোগীর চেহারা বা অবয়ব নষ্ট হওয়ার ভয় দূর করতে এখন প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বা ফ্রি ফ্ল্যাপের ব্যবহার বেড়েছে। এর ফলে রোগীর চেহারা যেমন ঠিক থাকে, তেমনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলা বা খাবার খাওয়ার ক্ষমতাও বজায় থাকে। বাংলাদেশের দক্ষ সার্জনরা এখন এসব জটিল অপারেশন দেশেই সফলভাবে সম্পন্ন করছেন।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, ক্যানসার জয় করার ক্ষেত্রে মানসিক শক্তি হচ্ছে রোগীর প্রধান হাতিয়ার। চিকিৎসা শেষে প্রথম দুই বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়েই রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। তাই নিয়মিত ফলোআপ এবং চিকিৎসকের দেওয়া পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং তামাক বর্জনের মাধ্যমে ক্যানসারমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।