ওরা জীবন দেয় মানুষের জন্য
প্রাণীর কোষে ক্রোমোজোম থাকে। ক্রোমোজোমে থাকে জিন। প্রাণীর বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্য কী হবে, তার নির্দেশনা থাকে জিনে। মানুষের জিনের সঙ্গে ধেড়ে ইঁদুরের জিনের মিল আছে। মানুষের শারীরবৃত্ত বোঝার জন্য ও চিকিৎসাবিদ্যার গবেষণায় ধেড়ে ইঁদুরের ব্যবহার শুরু হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক গবেষণায় আজও নিয়মিত ধেড়ে ইঁদুর ব্যবহার করছে।
শুধু ধেড়ে ইঁদুর নয়, আইসিডিডিআরবি গবেষণায় আরও কিছু প্রাণী ব্যবহার করে। এর মধ্যে আছে খরগোশ, ইঁদুর, গিনিপিগ ও ভেড়া। গবেষণায় ব্যবহৃত প্রাণীর জন্য আইসিডিডিআরবির পৃথক একটি শাখা আছে। প্রাণিসম্পদ শাখা নামে এই শাখাটি ১৯৬২ সাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় প্রাণী গবেষণাগার। এটি বাংলাদেশের একমাত্র গবেষণাগার, যেটাকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ সনদ ও স্বীকৃতি দিয়েছে।
নতুন কোনো চিকিৎসাপ্রযুক্তি, ওষুধ, টিকা আবিষ্কার ও এসবের কার্যকারিতা পরীক্ষায় বিশ্বজুড়ে নানা প্রজাতির প্রাণীর ব্যবহার করা হয়। মানুষের জন্য কোনো ওষুধ বা টিকা কার্যকর ও নিরাপদ কি না, তা দেখার জন্য ওই ওষুধ ও টিকা প্রথমে কোনো প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করা হয়। মানুষের সঙ্গে অনেক প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য, জিনকাঠামো ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে মিল আছে। প্রাণী গবেষণা (অ্যানিমেল রিসার্চ) ও প্রাণিসম্পদ কেন্দ্র (অ্যানিমেল রিসোর্স ফ্যাসিলিটি) নতুন কোনো আবিষ্কার, আবিষ্কৃত বিষয়ের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রাণী গবেষণা স্থাপনা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি তৈরি ও পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেশি। এসব স্থাপনার আবহাওয়া ও পরিবেশ সব সময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। প্রাণীদের দিতে হয় মানসম্পন্ন খাবার। উদ্দেশ্য একটাই—গবেষণায় ব্যবহৃত প্রতিটি প্রাণী যেন থাকে নীরোগ, অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী।
প্রাণী গবেষণা কেন্দ্রে একদিন
গত ১৯ অক্টোবর আইসিডিডিআরবির মহাখালীর প্রাণী গবেষণা কেন্দ্রে ঢোকার আগে এই প্রতিবেদককে বিশেষ ধরনের পোশাক পরানো হয়। অনেকটা অস্ত্রোপচারকক্ষে চিকিৎসকদের পোশাকের মতো। এত সতর্কতার একটাই কারণ, কোনো জীবাণু যেন কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতে না পারে।
দোতলা স্থাপনার ভেতরে গিয়ে দেখা যায় ধেড়ে ইঁদুর, গিনিপিগ, খরগোশ, ইঁদুর ও ভেড়ার জন্য পৃথক পৃথক আবাসনব্যবস্থা। বয়স ও লিঙ্গভেদে প্রতিটি প্রাণীর জন্য আলাদা থাকার আয়োজন। গর্ভবতী প্রাণীর জন্য অন্য রকম ব্যবস্থা। প্রতিটি প্রাণীর জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা। এসব প্রাণী পরিচর্যার দায়িত্বে ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
একটি স্ত্রী খরগোশের খাঁচার সামনে জীবনবৃত্তান্ত টাঙানো। জানা গেল খরগোশটির জন্ম ২০২১ সালের ১৪ আগস্ট। তাঁর মা–বার তথ্যও সেখানে লেখা। স্ত্রী খরগোশটি কোন তারিখে কোন পুরুষ খরগোশের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল, সেই তথ্যও লেখা আছে। এইভাবে প্রতিটি প্রাণীর তথ্য পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হয়।
আরেকটু দূরে একটি খাঁচার কাছে গিয়ে দেখা গেল, একটি ইঁদুর বেশ কয়কটি বাচ্চা প্রসব করেছে। বাচ্চাগুলো তখনো মায়ের সঙ্গে ছিল। উপযুক্ত বড় হলেই তাদের আলাদা স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে বলে কর্মকর্তারা জানালেন।
পাশাপাশি ২০টির বেশি ছোট ছোট কংক্রিটের চৌবাচ্চায় গিনিপিগদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি চৌবাচ্চায় প্রয়োজন অনুযায়ী খড় রাখা। আছে পানি পানের ব্যবস্থা। ভেড়ার থাকার ব্যবস্থা কেন্দ্রের নিচতলায়। রোগনির্ণয় পরীক্ষায় ভেড়ার রক্তের প্রয়োজন। নিচতলায় একটি খাঁচার মধ্যে দেখা গেল একটি মোরগও।
বর্তমানে শিশুর ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে জিংক বড়ি বা সিরাপের ব্যবহার রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তবে ব্যবহারের শুরুটা ইঁদুর দিয়েই।
প্রাণীগুলো কোন গবেষণায় লাগে
কেন্দ্রের প্রধান সুমন কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রের প্রতিটি প্রাণীর জন্য নীরোগ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। এক ধরনের প্রাণীর সঙ্গে অন্য ধরনের প্রাণীর মিলেমিশে বসবাসের কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া নিয়মিত প্রতিটি প্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। নিশ্চিত করা হয় প্রতিটি প্রাণীর পুষ্টিমান। কোনো প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়লে দল থেকে আলাদা করা হয়। এসব করার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল।
কেন্দ্রে লালন-পালন করা সুস্থ প্রাণীগুলোর ওপর নানা ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়। বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষার নাম দিয়েছেন ‘অ্যানিমেল মডেল’। যেমন ডায়রিয়া চিকিৎসায় জিংক কাজ করে কি না, তা প্রথমে দেখা হয়েছিল ইঁদুরের ক্ষেত্রে। প্রথমে কিছু ইঁদুরকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত করা হয়, তারপর ওই ইঁদুরগুলোকে জিংক খাওয়ানো হয়। ইঁদুরে সুফল পাওয়ার পর জিংক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে শিশুর ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে জিংক বড়ি বা সিরাপের ব্যবহার রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তবে ব্যবহারের শুরুটা ইঁদুর দিয়েই।
ইঁদুর বমি করতে পারে না, ইঁদুরের শরীরে ঘাম হয় না। এর অর্থ হচ্ছে ইঁদুরের শরীরে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য বাড়তি কিছু রয়েছে। ইঁদুরের জিনের সঙ্গে ৯৮ শতাংশ মিল আছে মানুষের জিনের। মানুষের প্রয়োজনে হওয়া গবেষণার ৭৪ শতাংশ প্রথমে ইঁদুরের ওপরে চালানো হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ৩৭টি নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিজ্ঞানীরা তাঁদের আবিষ্কারের গবেষণায় ইঁদুর ব্যবহার করেছিলেন। জিন কীভাবে কাজ করে, কোষ কীভাবে কাজ করে, শরীর কীভাবে বাইরের তথ্যের সমন্বয় ঘটায়—এসব মৌলিক গবেষণায় ইঁদুর ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিজ্ঞানীর প্রথমে দেখবেন খরগোশের কী হয়। তাই মাছের পেট থেকে ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহ করে তা খরগোশের পাকস্থলীতে ছেড়ে দিয়েছেন তাঁরা।
সাধারণত নতুন কোনো টিকার বিষাক্ততার পরীক্ষা করা হয় গিনিপিগের শরীরে ওই টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে। গিনিপিগের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা না গেলে ওই টিকা মানুষের জন্যও নিরাপদ বলে মনে করেন বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। ডিফথেরিয়া ও যক্ষ্মার টিকা উদ্ভাবনে গিনিপিগের ওপর বড় গবেষণা হয়েছিল।
ফরাসি রসায়নবিদ ও অণুজীববিজ্ঞানী লুই পাস্তুর জলাতঙ্ক রোগের টিকা আবিষ্কারের কাজে খরগোশ ব্যবহার করেছিলেন। সংক্রামক রোগ ও প্রতিষেধকবিদ্যার গবেষণায় বহুল ব্যবহৃত প্রাণী খরগোশ। কলেরার গবেষণায় খরগোশ ব্যবহার করা হয়। শল্য রশ্মি বা সার্জিক্যাল লেজারের উন্নতি করতে খরগোশ ব্যবহার করা হয়েছিল।
আইসিডিডিআরবির পরিবেশ গবেষণাগারের প্রধান জাহিদ হায়াত মাহমুদের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লোনাপানিতে বেড়ে ওঠা মাছের পেটে একধরনের ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন। এই ব্যাকটেরিয়ার (ভিবরিও প্যারাহেমোলাইটিকাস) সঙ্গে কলেরা বা ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী জীবাণুর মিল আছে। বিজ্ঞানীরা জানতে চান, এই ব্যাকটেরিয়া সত্যি সত্যি ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে কি না। তাই বিজ্ঞানীর প্রথমে দেখবেন খরগোশের কী হয়। তাই মাছের পেট থেকে ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহ করে তা খরগোশের পাকস্থলীতে ছেড়ে দিয়েছেন তাঁরা।
প্রাণীকে ন্যূনতম যন্ত্রণা দেওয়ার মধ্য দিয়েই গবেষণার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। যেখানেই প্রয়োজন হবে, সেখানেই প্রাণীর প্রজাতি অনুযায়ী স্থানীয় বা সাধারণ অবেদনকারী ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
নৈতিকতায় জোর
আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ বলছে, গবেষণার প্রাণীদের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে চলা হয়। গুরুত্ব দেওয়া হয় নৈতিকতার ওপর। সারা বিশ্বেই গবেষণায় প্রাণী ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে প্রাণী ব্যবহার নিয়ে নৈতিকতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তাতে প্রাণীর মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রাণীর সহজাত কিছু মূল্য বা গুরুত্ব আছে, যাকে সম্মান দেখাতে হবে। প্রাণীদের যন্ত্রণা অনুভব করার ক্ষমতা আছে, গবেষণার সময় তা মাথায় রাখতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে প্রাণীদের স্বার্থ রক্ষাও জরুরি।
গবেষণায় প্রাণী ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবির লিখিত নীতিবিষয়ক নির্দেশনা আছে। তাতে বলা আছে, গবেষণায় প্রাণী ব্যবহারের যৌক্তিকতাকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, প্রাণীগুলো থাকতে হবে পেশাগতভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে। এ ছাড়া বিধিবদ্ধ বা স্বীকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণীগুলো পরিচালন বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা আছে, প্রাণীকে ন্যূনতম যন্ত্রণা দেওয়ার মধ্য দিয়েই গবেষণার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। যেখানেই প্রয়োজন হবে, সেখানেই প্রাণীর প্রজাতি অনুযায়ী স্থানীয় বা সাধারণ অবেদনকারী ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যখনই কোনো প্রাণীর অসুস্থতা স্পষ্টভাবে দেখা যেতে থাকে তখনই ওই প্রাণীকে সদয়ভাবে মেরে ফেলতে হবে। সব সময় পরীক্ষায় প্রাণীর সংখ্যা ন্যূনতম রাখার চেষ্টা করতে হবে।
কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রাণী পুনর্ব্যবহারের সুযোগ নেই। অর্থাৎ এক পরীক্ষার ব্যবহৃত প্রাণী অন্য আর কোনো পরীক্ষায় ব্যবহার করার রীতি নেই। পরীক্ষা শেষে ব্যবহৃত প্রাণীগুলোকে গভীর ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়। সেই ঘুম আর ভাঙে না। প্রাণীগুলোর মৃতদেহ প্রিজম বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যায়।
২০২২ সালে ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়, ১০টি ওষুধ কোম্পানি, ১৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ও ৫টি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির কাছ থেকে প্রাণী কিনেছে।
গবেষণার প্রাণী বিক্রিও হয়
আইসিডিডিআরবির কাছ থেকে দেশের আরও কিছু প্রতিষ্ঠান এসব প্রাণী কিনে নেয়। এই তালিকায় আছে—ওষুধ কোম্পানি, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠান, ঢাকা শহরের কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিক, সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। গবেষণা ও শিক্ষার কাজে এসব প্রাণী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহার করা হয়।
১০ বছরের বেশি সময় ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ আইসিডিডিআরবির এই কেন্দ্র থেকে প্রাণী কিনে গবেষণাকাজ চালাচ্ছে। বিভাগের অধ্যাপক শেখ জুলফিকার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দুই মাস আগেও তারা কিছু ইঁদুর কিনেছে। ডায়রিয়া নিয়ে এক গবেষণায় ইঁদুরগুলো ব্যবহার করছে।
২০২২ সালে ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়, ১০টি ওষুধ কোম্পানি, ১৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ও ৫টি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির কাছ থেকে প্রাণী কিনেছে।
কেন্দ্রের প্রধান সুমন কুমার পাল বলেন, একটি খরগোশ বিক্রি হয় দুই হাজার টাকায়। তবে যে প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব প্রাণী বিক্রি করা হয় তাদের নীতিনৈতিকতা মেনে প্রাণী ব্যবহারের অনুরোধ জানায় আইসিডিডিআরবি।