বগুড়ায় শিক্ষিকাকে বিএনপি সন্ত্রাসী নির্যাতন করছে—এমন দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি ভারতের

কোলাজ প্রথম আলো গ্রাফিকস

এক নারীকে খোলা জায়গায় প্রকাশ্যে এক ব্যক্তি নির্যাতন করছেন, ১২ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘বগুড়ায় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকাকে ধর্ষণের পর নির্মম নির্যাতন করছে বিএনপির সন্ত্রাসী মাসুদ।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্মে একই রকম দাবিতে ভিডিওটি প্রচার করা হয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শুধু ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে প্রায় অর্ধশত পেজ ও প্রোফাইলে ভিডিওটি পাওয়া গেছে। ‘মুজাহিদের কান্না’ নামের একটি প্রোফাইল থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি প্রায় ১০ লাখ বার দেখা হয়েছে।

লিংক: এখানে

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটির সঙ্গে বগুড়ার কোনো ঘটনার সম্পর্ক নেই। এটি ভারতের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিপিন চৌহানের তৈরি ভিডিও। প্রকৃত প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে ভিডিওটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

ভিডিওটির মূল উৎস

ভিডিওটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে ‘Vipin Chauhan’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল পাওয়া যায়। একই ব্যক্তির ‘Vipin Chauhan Pro Wrestler’ নামে একটি ফেসবুক পেজও পাওয়া যায়। উভয় প্ল্যাটফর্মেই ভাইরাল ভিডিওটির হুবহু সংস্করণ রয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে ভিডিওটি ৪ সেপ্টেম্বর এবং এর আগে ১১ আগস্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। একই প্রোফাইলে একই নারী ও পুরুষকে একই স্থানে অভিনয় করতে দেখা যায়। এমন একাধিক ভিডিওও পাওয়া যায় প্রোফাইলটিতে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

এসব ভিডিওর ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, আলোচিত ভিডিওটি কোনো বাস্তব নির্যাতনের দৃশ্য নয়; বরং কনটেন্ট তৈরির উদ্দেশ্যে ধারণ করা অভিনয়ভিত্তিক ভিডিও।

বগুড়ার ঘটনার সত্যতা কতটুকু

ভিডিওতে যে দাবি করা হয়েছে, বগুড়ায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা যাচাই করতে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমে অনুসন্ধান করা হয়। কিন্তু ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ঘটনা বা প্রতিবেদনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ভিডিওটির মূল সংস্করণ ভারতের কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রোফাইলেই আগে থেকে প্রকাশিত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ভিডিওটিকে বগুড়ার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের দাবির সঙ্গে মূল উৎসের কোনো মিল নেই।

একই নির্মাতার আরও ভিডিও নিয়ে বিভ্রান্তি

চলতি বছরের জুনে একই নির্মাতার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, লিফটের সামনে একজন নারী বের হওয়ার সময় অপর পাশ থেকে লিফটে প্রবেশে অপেক্ষারত একজন পুরুষের অনিচ্ছাকৃত ধাক্কা লাগে। নারীর হাতে থাকা খাদ্যপণ্যর ব্যাগটি পড়ে যায়। এটা নিয়েই নারী প্রথমে পুরুষটিকে আক্রমণ করে পরবর্তী সময়ে তাদের দুজনের মধ্যে মারামারি বাধে।

লিফটের সামনে তাদের দুজনের মারামারির ভিডিও বাস্তব দাবিতে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যার ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘সিসি ক্যামেরায় ধরা না পড়লে কেউ বিশ্বাস করত না’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

পরে একই ভিডিও ভিপিন চৌহানের ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়। যাচাইয়ে সেটিও সাজানো ভিডিও বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

ভিপিন চৌহানের ফেসবুক পেজ ও ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল পর্যালোচনা করে নারী-পুরুষের মারামারি, বিরোধ ও বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। এসব কনটেন্ট মূলত বিনোদনের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।

ভিপিন চৌহান নিয়মিত অভিনয় ও বিনোদনমূলক ভিডিও প্রকাশ করা হলেও এসব কনটেন্টের মূল প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে নতুন ঘটনা, স্থান ও পরিচয় যুক্ত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এতে একটি সাজানো ভিডিওও বাস্তব নির্যাতন বা রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের কাছে উপস্থাপিত হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।