বর্ণিল আয়োজনে হাতিরঝিলে শেষ হলো আন্তর্জাতিক দৌড় প্রতিযোগিতা

কয়েক হাজার রানার ভোররাতেই যোগ দেন এই দৌড় প্রতিযোগিতায়। গতকাল হাতিরঝিলে

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। রাস্তাঘাট সুনসান, নীরব। হুসহাস দু–একটা গাড়ি রাস্তা ধরে ছুটে যাচ্ছে। রাতজাগা পাখিদের কলরব ভেসে আসছে। কিন্তু রাজধানীর হাতিরঝিলের পরিবেশ তখন একেবারেই ভিন্ন।

একই রকম জার্সি গায়ে জড়ো হয়েছেন কয়েক হাজার নারী–পুরুষ। কেউ হাত–পা ছুড়ছেন, কেউ–বা জায়গায় দাঁড়িয়েই লাফাচ্ছেন। দৌড়ানোর আগে গা গরম করে নিতে ব্যস্ত সবাই।

জাতীয় সংগীতের পর বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল দৌড়। স্থানীয় মানুষজনের পাশাপাশি অনেক বিদেশিকেও দৌড়াতে দেখা গেল, ছিল ছোট্ট শিশুরাও। আর তাদের সঙ্গে অভিভাবকেরাও দৌড়েছেন। হুইলচেয়ারে করেও দৌড়াতে দেখা গেল অনেককে।

‘রোড টু গ্লোরি’ (Road to Glory) স্লোগানকে সামনে রেখে গতকাল শুক্রবার ভোরে রাজধানীর হাতিরঝিলে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে হয়ে গেল রানিং ইভেন্ট ‘তুরাগ অ্যাকটিভ ঢাকা ২৫কে ২০২৬’-এর তৃতীয় আসর। স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ‘রান বাংলাদেশ’ (Run Bangladesh)-এর আয়োজনে এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় অ্যাকটিভওয়্যার ব্র্যান্ড ‘তুরাগ অ্যাকটিভ’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় এ আয়োজনে দেশ-বিদেশের প্রায় তিন হাজার পেশাদার ও শৌখিন রানার অংশগ্রহণ করেন।

ভোর চারটায় মহানগর হাতিরঝিল বাসস্টপের নতুন স্টার্ট পয়েন্ট থেকে ২৫ কিলোমিটারের মূল রেসটি শুরু হয় এবং রানাররা হাতিরঝিলের নতুন অ্যান্টি-ক্লকওয়াইজ (ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে) ট্র্যাকে দৌড়ান। বৃষ্টিহীন, তবে কিছুটা গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও রানারদের উদ্দীপনা ও প্রাণশক্তিতে কোনো ঘাটতি ছিল না।

পেশাদার ও শৌখিন রানাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এই প্রতিযোগিতায়
ছবি: রান বাংলাদেশের সৌজন্যে

আয়োজনটি নিছক কোনো প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রানিং কমিউনিটিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম। এবারের আসরের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ইভেন্টটি গ্লোবাল ম্যারাথন সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথনস অ্যান্ড ডিস্ট্যান্স রেসেস (AIMS)-এর পূর্ণ সদস্য এবং এর সম্পূর্ণ রুট ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস কর্তৃক সার্টিফায়েড।

এ ছাড়া এবার ইভেন্টে নতুনত্ব আনতে এবং খেলাধুলায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো ‘৩ কিলোমিটার হুইলচেয়ার’ ক্যাটাগরি চালু করা হয়েছে।

বিজয়ীদের তালিকা

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই রেসে দেশ-বিদেশের রানাররা তাঁদের অসামান্য ফিটনেস ও গতির প্রমাণ রেখেছেন। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে যাঁরা শীর্ষ স্থান অধিকার করেছেন:

২৫কে (পুরুষ বিভাগ):

●     চ্যাম্পিয়ন: মামুন আহমেদ (Mamun Ahmed)—সময়: ১ ঘণ্টা ৩২ মিনিট ২২ সেকেন্ড

২৫কে (নারী বিভাগ):

●     চ্যাম্পিয়ন: হামিদা আক্তার জেবা (Hamida Akter Jeba)—সময়: ২ ঘণ্টা ০০ মিনিট ১৮ সেকেন্ড

১০.৩কে (পুরুষ বিভাগ):

●     চ্যাম্পিয়ন: পলাশ শেখ (Palash Shaikh)—সময়: ৩৫ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড

অন্ধকার থাকতেই দৌড়বিদেরা নেমে পড়েন হাতিরঝিলের ট্র্যাকে
ছবি: রান বাংলাদেশের সৌজন্যে

১০.৩কে (নারী বিভাগ):

●     চ্যাম্পিয়ন: পারুল দাস (Parul Das)—সময়: ৫৭ মিনিট ১০ সেকেন্ড

২৫কে ভ্যাটেরান ক্যাটাগরি (৫০ বছর ও তদূর্ধ্ব—পুরুষ):

●     চ্যাম্পিয়ন: মো. খোরশেদ আলম (MD. Khorshed Alam)—সময়: ২ ঘণ্টা ০৯ মিনিট ২৯ সেকেন্ড

২৫কে ভ্যাটেরান ক্যাটাগরি (৫০ বছর ও তদূর্ধ্ব—নারী):

●     চ্যাম্পিয়ন: নিপু রানী মিত্র (Nipu Rani Mitra)—সময়: ৩ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৪৩ সেকেন্ড

৩কে কিডস ক্যাটাগরি (৮ বছর ও তদূর্ধ্ব—বালক):

●     চ্যাম্পিয়ন: অভি ইসলাম—সময়: ১০ মিনিট ৪০ সেকেন্ড

৩কে কিডস ক্যাটাগরি (৮ বছর ও তদূর্ধ্ব—বালিকা):

●     চ্যাম্পিয়ন: সামিহা নেহা—সময়: ১৪ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড

এবারের আসরে বিজয়ীদের জন্য সর্বমোট দুই লাখ টাকা প্রাইজমানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সফলভাবে রেস সম্পন্নকারী সব রানারের জন্য ছিল আকর্ষণীয় ‘ফিনিশার মেডেল’।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান রান বাংলাদেশ-এর সিইও এবং রেস ডিরেক্টর সাজনান মোহাম্মদ সফল সমাপ্তির পর অংশগ্রহণকারী ও পার্টনারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘গত দুই আসরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবারের তৃতীয় আসরটি আমরা আরও বড় পরিসরে এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে আয়োজন করেছি। রানারদের উপস্থিতি ও স্বতঃস্ফূর্ততা প্রমাণ করে যে আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি।’

ফিনিশ লাইনে রানারদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, একে অপরকে উৎসাহিত করা এবং সাফল্যের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক অপূর্ব দৃশ্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের আয়োজন।