মুছে যাচ্ছে জুলাই গ্রাফিতির রং

জুলাই অভ্যুত্থানে গণমানুষের প্রত্যাশা উদ্ভাসিত হয়েছিল গ্রাফিতিগুলোয়। অবহেলায় মুছে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের হাতে আঁকা সেই শিল্প।

গ্রাফিতি হয়ে উঠেছিল চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের প্রতিবাদের ভাষা। সময়ের প্রবাহে গ্রাফিতির সেই উজ্জ্বল ছবিতে জমেছে ধুলা। কোথাও কোথাও রং উঠে ঝাপসা হয়ে গেছে বুকের ভেতরে আগুন জ্বালানো সেসব লেখা। গত বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ছবি: সাজিদ হোসেন

বেলা শেষের ধূপছায়া সন্ধ্যার ম্লান আলোর মতো মলিন হয়ে এসেছে দেয়ালে দেয়ালে আঁকা উজ্জ্বল গ্রাফিতিগুলো। এখন থেকে দুই বছর আগের উত্তাল জুলাইয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রংতুলি, ব্রাশ, স্প্রের ক্যান নিয়ে নেমে পড়েছিলেন রাজপথে। ঢাকাসহ সারা দেশের শহরে শহরে তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস–আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভবনের দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, উড়াল সড়ক আর মেট্রোরেলের স্তম্ভ ভরিয়ে তুলেছিলেন অজস্র লেখা আর অঙ্কনের মেলবন্ধনে। ​​​‘গ্রাফিতি’ নামের প্রতিবাদের এই নতুন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আর আগামী দিনের স্বপ্ন। গ্রাফিতি হয়ে উঠেছিল এক নতুনতর জন–অভিব্যক্তির ভাষা। গণমানুষের এক ভিন্নতর কণ্ঠস্বর।

আধিপত্যবাদী স্বৈরশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া জুলাই অভ্যুত্থানে গণমানুষের প্রত্যাশা উদ্ভাসিত হয়েছিল গ্রাফিতিগুলোতে। এতে কেবল গণতন্ত্র, সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশে অবাধ নির্বাচনের কথাই ছিল না, ছিল সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত সমতাভিত্তিক সমাজ, মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতি, দলীয়করণ, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মুক্তির মতো আরও অনেক মানবিক আকাঙ্ক্ষার কথা।

শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধর প্রতিকৃতির পাশাপাশি ‘ছিঁড়ে ফেলা শিকল’, ‘ভেঙে ফেলা দেয়াল’, ‘উদিত সূর্য’, ‘মুক্ত বিহঙ্গ’র মতো বহু প্রতীকী ছবি লেখাগুলোকে আরও তীব্র ও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। মানুষ দেয়ালে দেয়ালে আঁকা রঙিন গ্রাফিতিগুলো আগ্রহ নিয়ে অবলোকন করেছেন।

দুই বাহু প্রসারিত শহীদ আবু সাঈদের বীরোচিত ভঙ্গি এসব গ্রাফিতিতে হয়ে উঠেছিল সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক। শহীদ মুগ্ধর ছবি আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ​অমর কবিতার চরণ ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ জুগিয়েছে প্রেরণা। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’, ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাই’, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা দেশটা কারও বাপের না’, ‘যদি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ; যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ’, ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’,​‘রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে’, ​‘ভয়হীন ভবিষ্যৎ চাই’—এমন অনেক আবেগ ও আশার অকপট স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটেছিল অগণিত গ্রাফিতিতে।

এসব লেখার সঙ্গে ছিল ছবিও। শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধর প্রতিকৃতির পাশাপাশি ‘ছিঁড়ে ফেলা শিকল’, ‘ভেঙে ফেলা দেয়াল’, ‘উদিত সূর্য’, ‘মুক্ত বিহঙ্গ’র মতো বহু প্রতীকী ছবি লেখাগুলোকে আরও তীব্র ও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। মানুষ দেয়ালে দেয়ালে আঁকা রঙিন গ্রাফিতিগুলো আগ্রহ নিয়ে অবলোকন করেছেন। সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। ভিডিও করে ছড়িয়ে দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। ফলে দেশ–বিদেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে জুলাইয়ের গ্রাফিতি গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তি–প্রেরণার উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ধানমন্ডির বিভিন্ন সড়কে, লালমাটিয়ায়, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পাশের দেয়ালে দেখা গেল, ‘পেস্ট কন্ট্রোল’, ‘তেলাপোকা-ছারপোকা দমন’, ‘ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হচ্ছে’—এমন বিজ্ঞাপন।

দুই বছর পরে রং মলিন, অযত্নের ছাপ

সময়ের অনিবার্য প্রবাহে সেই উজ্জ্বল গ্রাফিতিতে জমেছে ধুলা। কোথাও কোথাও ঝাপসা হয়ে গেছে বুকের ভেতরে আগুন জ্বালানো সেসব লেখা। রাজধানীর অনেক স্থানের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলোর জায়গা দখল করে নিচ্ছে দলীয় রাজনীতির স্লোগান। চটকদার সব বিজ্ঞাপনের প্রচার। মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউটের সীমানাপ্রাচীরসহ অনেক জায়গায় গ্রাফিতির ওপর পড়েছে সাদা রঙের প্রলেপ; স্কুল-কোচিংয়ের প্রচারে লেখা হয়েছে, ‘ভর্তি চলছে’, ‘ইংলিশ ভার্সন কোচিং’। ধানমন্ডির বিভিন্ন সড়কে, লালমাটিয়ায়, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পাশের দেয়ালে দেখা গেল, ‘পেস্ট কন্ট্রোল’, ‘তেলাপোকা-ছারপোকা দমন’, ‘ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হচ্ছে’—এমন অনেক বিজ্ঞাপন। কোথাও কোথাও চোখে পড়ল ‘রুম ভাড়া’, ‘ফ্ল্যাট বিক্রয়’, ‘রেন্ট-এ-কার’, ‘কাজি অফিস’–এর মতো বিবিধ বিজ্ঞপ্তি। কোনো দেয়ালের গ্রাফিতি ঢেকে দিয়েছে নানা পোস্টার। যেখানে ছিল স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের দাবি, সেখানে এখন জ্বলজ্বল করছে ‘মোবাইল রিচার্জের বিজ্ঞাপন।’

সময়ের প্রবাহে দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বহু আত্মদানের রক্তস্রোত, বহু ত্যাগের রঙে রঙিন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মর্মবাণী ধারণ করা গ্রাফিতিতে লেখা স্বপ্ন–সাধের কথা যেন জাতির মানসপট থেকে মুছে না যায়।

দেয়াল থেকে প্রায় মুছে যাওয়া, বিবর্ণ হয়ে পড়া এসব গ্রাফিতি কোনো বড় শিল্পীর শিল্পকর্ম ছিল না; নগরবাসীর চোখের সামনেই একটি দীপ্ত তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের হাতে সৃষ্টি হয়েছিল এই ‘গণশিল্প’। বিভিন্ন পেশাজীবী, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, তরুণ শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন যাতায়াতের সময় তাঁদের চলাচলের পথে এসব গ্রাফিতির দিকে তাকাতেন। অবচেতনেই তাঁদের চেতনায় এর একটা ছাপ আঁকা হয়ে যেত। আজ অযত্নে, অবহেলায় মুছে যাচ্ছে সেই শিল্প।

ফ্যাসিবাদবিরোধী উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের দিনে সহপাঠীদের সঙ্গে টিএসসিতে গ্রাফিতি এঁকেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার। ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে তিনি বললেন, ​‘আমরা ঝুঁকি নিয়ে গ্রাফিতি এঁকেছিলাম। মনে হয়েছিল দেশটা এবার বদলাবে। রঙিন দেয়াল দেশটাকেও রাঙিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে অনেক ভিন্ন!’ 

গ্রাফিতি মুছে ফেলে সেখানে আঁকা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনী চিত্র। কোথাও কোথাও সাঁটানো হয়েছে পোস্টার। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউটের দেয়ালে
ছবি: প্রথম আলো

স্থায়ী হতে পারে গ্রাফিতির ভাষা

জুলাই অভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য ছিল না। শিক্ষার্থীদের শুরু করা এই আন্দোলনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের বিপুল অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তা নাগরিক জাগরণে পরিণত হয়েছিল। শুধু নিরপেক্ষ নির্বাচন নয়, দেশকে নতুন করে সাজানোর যে সাধ নাগরিকেরা বুকে আগলে রেখেছেন, তারই প্রকাশ ঘটেছিল ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’সহ অনেক গ্রাফিতিতে। গ্রাফিতিগুলো হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের চিন্তা, চেতনা ও দর্শনের প্রকাশ। এই গ্রাফিতির ভাষা হয়ে উঠতে পারত আমাদের রাজনীতির স্থায়ী ভাষা। এগুলোকে স্থায়ীভাবে, অন্তত নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সংরক্ষণ করা যেতে পারত। হয়তো এখনো সেই সময় শেষ হয়ে যায়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, যিনি নিজেও জুলাই আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, প্রথম আলোকে বললেন, ‘আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীসহ সারা দেশে গ্রাফিতি অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল।...তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কাঁচা হাতের লেখা ও আঁকায় তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এতে প্রকাশ করেছিল। বক্তব্য ছাড়া এর একটা নান্দনিক দিকও ছিল।’

সময়ের প্রবাহে দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বহু আত্মদানের রক্তস্রোত, বহু ত্যাগের রঙে রঙিন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মর্মবাণী ধারণ করা গ্রাফিতিতে লেখা স্বপ্ন–সাধের কথা যেন জাতির মানসপট থেকে মুছে না যায়।