নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার প্রত্যাশা

ইফতেখারুজ্জামানফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘ সময় ধরে যে বিশাল জনপ্রত‍্যাশা ও গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল, তার ধারাবাহিকতায় দেশে অবশেষে ভোট গ্রহণ হচ্ছে আজ। পর্যায়টি কেবল একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নয়, রক্তরঞ্জিত একটি বিরাট স্বপ্নপূরণের ভিত্তি স্থাপনের পবিত্র দায়িত্ব। শান্তিপূর্ণভাবে সত্যিকার অর্থেই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভোটাররা পরিচয় ও অবস্থাননির্বিশেষে কোনো প্রকার প্রভাব, প্রতিকূলতা, ভয় ও ঝুঁকিমুক্তভাবে ও নির্বিঘ্নে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীদের বেছে নিতে পারবেন—এমনটিই সবার প্রত্যাশা। সেটি কতটুকু পূরণ হবে, তা ভোটের দিনটিই বলে দেবে।

তবে প্রত্যাশার পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে আমাদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পুঁজির পাঁচটি উপাদান নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সেগুলো হলো: অর্থ, পেশি, ধর্ম, পুরুষতন্ত্র ও গরিষ্ঠতন্ত্র। দেশের নির্বাচনী রাজনীতি এই পাঁচটি উপাদানের ওপর সব সময়ই অতিনির্ভরশীল ছিল, যা এখন অধিকতর গুরুত্ব পেয়ে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরির পথে প্রধান অন্তরায় হয়েছে। এদের পারস্পরিক সংমিশ্রণ প্রভাবশালী দল, প্রার্থী, কর্মী-সমর্থকদের জন্য অন্যায্য সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন অর্থ, পেশি ও ধর্মান্ধতার সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিকতা ও গরিষ্ঠতন্ত্রের ক্ষমতার মিলন ঘটে, তখন সাধারণ মানুষ তো বটেই, সেই সঙ্গে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধীসহ অন্য সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার চর্চা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। মাঠপর্যায়ের তথ‍্য অনুযায়ী এ ঝুঁকির প্রকটতার কারণে ব‍্যাপক উৎকণ্ঠা রয়েছে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও শঙ্কামুক্ত নয়। বিশেষ করে সহিংসতাকে কেবল ফিজিক্যাল ভায়োলেন্স বা হতাহতের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করার যে প্রবণতা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে রয়েছে, তা একমুখী দৃষ্টি। সহিংসতার প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে ভীতির পরিবেশ তৈরিকেও বড় ধরনের সহিংসতা হিসেবে গণ্য করতে হবে। এটিই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া সহিংসতা এখন আর কেবল অফলাইনে সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইন মাধ্যমে অপপ্রচার, কুৎসা ও ভীতি প্রদর্শন ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করছে। ভোটের দিনেও প্রথাগত সহিংসতার চেয়ে ‘সফিস্টিকেটেড’ বা কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বেশি থাকবে বলে মনে হয়।

বিএনপি এই নির্বাচনে মনিটরিং করার প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি নতুন ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম এবং নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক ভূমিকায় দ্বৈততা ও প্রভাব সৃষ্টি করবে। যখন কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নিজস্বভাবে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রভাববলয় তৈরির চেষ্টা করে, তখন তা সাধারণ ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের পরিবেশকে বিনষ্ট করবে। অন‍্যদিকে ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণামূলকভাবে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে জামায়াত। প্রচারের শুরুর দিকে কিছুটা সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ থাকলেও ক্রমান্বয়ে উভয় পক্ষ ক্ষমতার রাজনৈতিক অসুস্থ রাজনীতির হাতে জিম্মিদশার পরিচয় দিচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক মহল ও দেশে-বিদেশে বড় বিতর্ক হিসেবে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি। তবে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে দুভাবে উপস্থিত রয়েছে। প্রথমত তারা ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার পাশাপাশি প্রতিহত করার নামে নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে চাইছে। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে তাদের কর্মী-সমর্থকেরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং সিংহভাগ ক্ষেত্রে ভোটও দেবেন, এটাও পরিষ্কার। কারাগারে থাকা দলটির উচ্চপর্যায়ের নেতারাও সক্রিয়ভাবে ভোটাধিকার চর্চা করেছেন। মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট নিজের পক্ষে টানার জন্য অন্য প্রার্থী ও দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে; যাতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সোৎসাহে এগিয়ে রয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগ ভোটার, সমর্থক এবং অদৃশ্য প্রভাবক হিসেবে এই নির্বাচনে পুরোপুরি বিদ্যমান।

নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে চোরতন্ত্রের অবকাঠামো চুরমার করে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা হলো, দলগুলোর নিজস্ব ইশতেহার ও প্রচারের অঙ্গীকার এবং জুলাই জাতীয় সনদের চেতনা অনুযায়ী পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক, সুশাসিত ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নে সময়সীমাসহ একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা জরুরি। সরকার কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করবে না, বরং প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের জন‍্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে—এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করাই হবে আগামীর মূল চ্যালেঞ্জ। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।