শিল্প–সংস্কৃতিতে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কথা কম এসেছে

জাতীয় নাগরিক কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক নাওমি হোসাইন। গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরে কমিটির কার্যালয়েপ্রথম আলো

শিল্পকর্ম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের বিষয়টি খুব কমই এসেছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক নাওমি হোসাইন। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অধ্যয়ন করতে তরুণ প্রজন্মসহ সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ওই দুর্ভিক্ষ যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের গল্প শুনতে হবে, সেই তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। দুর্ভিক্ষের ভেতর দিয়ে যাঁরা গেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘ওরাল হিস্ট্রি’ (কথ্য ইতিহাস) লেখা সম্ভব।

অতীতে কেন দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তা যদি মানুষ না জানে, তাহলে ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি রোধ করার ক্ষেত্রে সঠিক ভূমিকা পালন করা যায় না উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক নাওমি হোসাইন। গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় নাগরিক কমিটি আয়োজিত ‘রাজনৈতিক বক্তৃতামালা সিরিজ: পর্ব-৩’ অনুষ্ঠানের বক্তা ছিলেন নাওমি হোসাইন। তাঁর বক্তব্যের শিরোনাম ছিল ‘১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ: বাংলাদেশের রাজনীতি ও উন্নয়নপন্থায় প্রভাব’।

রাজধানীর বাংলামোটরের রূপায়ন ট্রেড সেন্টারে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক নাওমি হোসাইনের বক্তব্যে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে চারটি কারণ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, চার কারণ হলো: ১৯৭৪ সালের মারাত্মক বন্যা, দুর্ভিক্ষ-অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক খাদ্যসহায়তার রাজনীতি এবং দেশীয় খাদ্য ও ত্রাণের রাজনীতি।

কেন ওই দুর্ভিক্ষ—এর প্রথম কারণ হিসেবে নাওমি হোসাইন বলেন, ১৯৭৪ সালে মারাত্মক বন্যা হয়েছিল। সেই বন্যায় অনেক মানুষ তাঁদের বাড়িঘর ও চাকরি হারিয়েছিলেন, ফসল নষ্ট হয়েছিল। অনেকে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি দুর্ভিক্ষ-অর্থনীতির কথা বলেছেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তখন পর্যাপ্ত খাদ্য ছিল না, কথাটি সম্ভবত সত্য নয়। এ প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী ভারতের অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্ভবত পর্যাপ্ত খাদ্য ছিল, কিন্তু তা কেনার টাকা মানুষের কাছে ছিল না।

১৯৭৪ সালের খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অধ্যাপক নাওমি হোসাইন বলেন, চালের দাম দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া ভারতে চোরাচালান, সিন্ডিকেট ইত্যাদিও দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল।

দুর্ভিক্ষের তৃতীয় কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক খাদ্যসহায়তার রাজনীতির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র এক বছরের বেশি সময়ের জন্য খাদ্যসহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশ একটি কমিউনিস্ট দেশ কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য করেছিল।...মিসরকে তখন খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলেও বাংলাদেশকে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তাদের নীতি গ্রহণে বাধ্য করতে চেয়েছিল। চতুর্থ কারণ হলো দেশীয় খাদ্য ও ত্রাণের রাজনীতি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তখন খুবই দুর্বল। সরকার ছিল দেউলিয়া, খাদ্য আনতে পারেনি।

চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে ‘দ্য এইড ল্যাব: আন্ডারস্ট্যান্ডিং বাংলাদেশ’স আনএক্সপেক্টেড সাকসেস’ নামে বই লিখেছেন অধ্যাপক নাওমি হোসাইন। নিজের লেখা বই নিয়েও কথা বলেন তিনি। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, বইটির মূল বক্তব্য ও আলোচনা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় ছিল। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল দুর্ভিক্ষের আলোচনা তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে।

নাওমি হোসাইন বলেন, বইটি লেখার ক্ষেত্রে তাঁর কাছে বড় প্রেরণা ছিল তরুণ প্রজন্ম। দুর্ভিক্ষের ইতিহাস তিনি তরুণদের সামনে নিয়ে আসতে চেয়েছেন।

বাসন্তীদের অবস্থা ওই ছবির মতোই ছিল

বক্তব্যের মধ্যে দুর্ভিক্ষ নিয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুটি ছবি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে দেখান অধ্যাপক নাওমি হোসাইন। পরে তিনি বলেন, দুর্ভিক্ষের জন্য অনেকেই শেখ মুজিবকে দায়ী করতে চান। নিশ্চিতভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এটাও স্পষ্ট যে তিনি চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন।...তখন দেশে যে খাদ্য ছিল, তার বেশির ভাগই শহুরে মধ্যবিত্তদের কাছে রেশন আকারে দেওয়া হয়েছিল। গরিবদের দেওয়া হয়নি।

বক্তব্য শেষ করার পর এক প্রশ্নের জবাবে নাওমি হোসাইন বলেন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় বাসন্তীর যে ছবিটি (আলোকচিত্র) ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল, সেই ছবি আসলে ‘স্টেজড’ (সাজানো) ছিল। তবে বাসন্তীদের আসল অবস্থা তখন ওই ছবির মতোই ছিল।

প্রশ্নোত্তর পর্বে নাওমি হোসাইন জানান, তাঁর বাবা বাংলাদেশি আর মা আইরিশ।

‘জিয়াবাদ-মুজিববাদ চাই না’

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন জাতীয় নাগরিক কমিটির নির্বাহী সদস্য আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, তাঁরা যে নতুন রাজনৈতিক দল করতে যাচ্ছেন, সেখানে পড়াশোনা ও আলোচনার চর্চা অব্যাহত রাখা হবে।

নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা কোনো জাতিগত বিদ্বেষ চাই না, কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম চাই না। আদর্শিক বিভাজন থেকে আমরা সরে আসতে চাই। জিয়াবাদ বলুন, মুজিববাদ বলুন—আমরা কোনো “বাদ” বাংলাদেশে চাই না।’