জুলাই যোদ্ধা মিজানুর ব্যস্ত জীবন থেকে এখন পরনির্ভরশীল জীবনে

জুলাই যোদ্ধা মিজানুর রহমানছবি: সংগৃহীত

দুই বছর আগেও শহরের ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেও ব্যস্ত জীবন কাটাতেন। একটু হাঁপ ছেড়ে আরাম করতে ইচ্ছা হতো। এখন অফুরন্ত অবসর ক্লান্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া-আসা আর বাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি ছাড়া আর তেমন কিছু করার নেই। শহরে আসতে হলে সঙ্গী লাগে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বুলেটে দৃষ্টি হারানো মো. মিজানুর রহমান (৪২) আগের দিনগুলোর সঙ্গে নিজের জীবনকে আর মেলাতে পারেন না। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট মিরপুর মডেল থানা থেকে পুলিশ গুলি করা শুরু করলে গুলিবিদ্ধ হন তিনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৬৫ জন। তালিকাভুক্ত আহত যোদ্ধা ১৫ হাজার ৯০৩ জন। তাঁদেরই একজন মিজানুর।

আরও পড়ুন

কী হয়েছিল সেদিন

অষ্টম শ্রেণি পাস মিজানুর রহমানের বাড়ি লালমনিরহাটের সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের ঢাকনাই কুড়ারপাড় গ্রামে। তিনি ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসে একজন প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ছিলেন। তাঁর বেতন ছিল ২৪ হাজার টাকা, আর ওই প্রকৌশলী তাঁর অফিসের কিছু কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে মাসে আরও ৫-৬ হাজার টাকা দিতেন। মাসে তাঁর আয় হতো ৩০-৩২ হাজার টাকা। ডিওএইচএসেই কয়েকজন মিলে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন মিজানুর।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিকেলে আনন্দমিছিলে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন মিজানুর।

দুই বছর আগের সে দিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এর কয়েক দিন আগে থেকেই তিনি মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)–এর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিছিলে যেতেন। ৫ আগস্ট সকালে একবার তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন শাহবাগে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তবে সরকার পতনের পর বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তাঁরা মিরপুর ১০ নম্বর থেকে গণভবনের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।

মিজানুর বলেন, ওই সময় লোকজন মিরপুর মডেল থানার বন্ধ ফটকে ধাক্কা দিতে দিতে পিলারসহ ভেঙে ফেলার মতো অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন। থানার ছাদ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি আসা শুরু করে। তিনি দৌড়ে কয়েকজনের সঙ্গে একটি গাছের আড়ালে গিয়ে বসেন। হুট করেই খেয়াল করেন তাঁর মাথা, চোখসহ পুরো মুখমণ্ডল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তিনি চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছেন না।

তখন আর্তনাদ করে আশপাশের মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকেন মিজানুর। কিন্তু সবাই প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করছিলেন, কেউ সাড়া দিচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে মিজানুর সামনে ছুটতে থাকা দুই ব্যক্তির টি–শার্ট টেনে ধরেন ও সাহায্য চান। মিজানুরের ভাষায়, ‘দুজনের কণ্ঠ ও কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারি, ওরা শিক্ষার্থী।’

মিরপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। ১৮ জুলাই, ২০২৪
ফাইল ছবি: খালেদ সরকার

ওই দুই শিক্ষার্থী তাঁকে একটি রিকশায় উঠিয়ে কাছে কাছের আলোক হাসপাতালে নিয়ে যান। মুঠোফোন থেকে নম্বর নিয়ে ওই তরুণেরা তাঁর স্ত্রী ও গাড়ির মালিককে কল করেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে দুই তরুণ তাঁকে এরপর দারুস সালাম গ্রিন ডেলটা হাসপাতালে এবং পরে আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে যান।

সে সময় ওই দুই তরুণের সঙ্গে মিজানুর যে গাড়ি চালাতেন, সেই গাড়ির মালিক, ভায়রা ও বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক যোগ দেন। মিজানুরের স্ত্রী পরদিন ছোট মেয়ে আর শ্যালককে নিয়ে হাসপাতালে আসেন।

মিজানুরের স্ত্রীর নাম মোসা. নুরজাহান বেগম (৩২)। তাঁদের দুই সন্তান মোসা. মারিয়ম (১৫) ও মোসা. মারিয়া (৯) মাদ্রাসায় পড়ে।

যেভাবে দিন চলে এখন

২০২৪ ও ২০২৫ সালে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে মিজানুরের দুই চোখে মোট পাঁচটি অস্ত্রোপচার হয়েছে। বাঁ চোখে তিনটি ও ডান চোখে দুটি।

তিনি বলেন, ‘ডান চোখে কিছু দেখি না। বাঁ চোখেও ঝাপসা দেখি। ডাক্তার বলেছে, বাঁ চোখে দেখা যায় ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ। চার মাস পরপর চোখ দেখাইতে ঢাকায় যাওয়া লাগে।’

চোখে দেখেন না বলে জীবন এখন পরনির্ভরশীল হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন মিজানুর।

এখন গ্রামের বাড়িতে মা–বাবা আর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন মিজানুর। তাঁর বাবার নাম মো. আলতাফ হোসেন (৬৫), মায়ের নাম মোসা. হামিদা বেগম (৫৫)। চার ভাই এক বোনের মধ্যে মিজানুর সবার বড়। ছোট্ট বসতভিটায় আধা পাকা বাড়ির একেকটি কক্ষ একেক ভাইয়ের। বাবা বর্গা চাষি। তিন ভাই ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তাঁরা সেখানেই থাকেন। বোনেরও আলাদা সংসার।

আরও পড়ুন

মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার এক ফাঁকে কথা হয় তাঁর বাবা আলতাফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছেলে চোখে দেখে না ভাবলেই মনে কষ্ট লাগে। তাঁর কোনো সামর্থ্য নেই যে ছেলেকে একটু সাহায্য করবেন।

মিজানুর জানান, তিনি এখন সরকারি ভাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত হিসেবে মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পান। গাড়িচালক হিসেবে ২ বছর আগে মাসে এর চেয়ে ১০ হাজার টাকা বেশি আয় করতেন। শুধু ভাতার টাকা দিয়ে মাসে চলা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মাসে দুই হাজার টাকার বেশি ওষুধের পেছনেই খরচ হয়। ঢাকায় চিকিৎসার জন্য গেলে খরচ আরও বেড়ে যায়।

অতি গুরুতর আহত যোদ্ধাদের ‘ক’ শ্রেণি, গুরুতর আহত যোদ্ধাদের ‘খ’ শ্রেণি এবং সাধারণ আহত যোদ্ধাদের ‘গ’ শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করেছে সরকার।

‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত যোদ্ধাদের ধরনের মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম এক চোখ বা হাত বা পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অনুপযোগী। সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, সম্পূর্ণরূপে মানসিক বিকারগ্রস্ত, অঙ্গহানি, গুরুতর আহত হয়ে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে অক্ষম।

এ তালিকায় থাকা আহত ব্যক্তিরা মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। ‘খ’ শ্রেণিভুক্তদের আহত হওয়ার ধরনের বিবরণে বলা হয়েছে, ‘আংশিক দৃষ্টিহীন, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনুরূপ আহত ব্যক্তি।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাঁদের শ্রবণশক্তি বা দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গুলিতে আহত বা অনুরূপভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁদের ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। ‘খ’শ্রেণিভুক্ত যোদ্ধারা ১৫ হাজার টাকা এবং ‘গ’শ্রেণিভুক্ত যোদ্ধারা মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন।

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর গণভবনের সামনে উল্লসিত মানুষ। ৫ আগস্ট, ২০২৪
ফাইল ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

মিজানুর বলেন, তাঁর দৃষ্টিশক্তি এমন পর্যায়ে যে তিনি আর কোনো কাজ করতে পারেন না। সরকারের অনুদান, বিভিন্ন সংস্থার সহায়তাসহ তিনি মোট ১১ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকার অনেকখানিই খরচ হয়ে গেছে। যতবার ঢাকায় যান, ততবার সঙ্গে করে লোক নিয়ে যেতে হয়। নিজের ও বাড়তি লোকের খরচ আছে।

এক বছর আগে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে ১৭ শতকের ওপর একটি সুপারিবাগান বন্ধক নেন মিজানুর। ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা দিয়ে কেনেন ৩টি গরু। তবে সুপারিবাগান থেকে ১ বছরে ১৩ হাজার টাকা আয় করলেও গরু থেকে এখনো কোনো আয় আসেনি। উল্টো গরুর খাওয়া ও যত্নে মাসে ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এসব কাজের দেখভাল তাঁর স্ত্রীই করেন। অতিরিক্ত কাজের চাপে স্ত্রীও এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এই জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করছেন মিজানুর। মনটা মাঝেমধ্যে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। জীবনের চরম সংকটের মুহূর্তে দরদি ও সুযোগসন্ধানী—দুই ধরনের মানুষের দেখা একই সঙ্গে হয়েছিল। হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় যখন পড়ে ছিলেন, তখন এক লোক তাঁর পকেট থেকে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। মানিব্যাগ আর মুঠোফোন রক্ষায় একপর্যায়ে তিনি হাত দিয়ে পকেট চেপে শুয়ে ছিলেন।

তবে সব ছাপিয়ে তাঁর মনজুড়ে রয়েছেন উদ্ধারকারী সেই দুই তরুণ। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে বাড়িতে ফিরে যাওয়া সেই তরুণদের মুঠোফোন নম্বর নেওয়ার কথা তখন মাথায় ছিল না। ওই তরুণদের কথা বলতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন তিনি। ধরা গলায় বলেন, ‘ওদের দেখতে খুব ইচ্ছা হয়। একবার যদি দেখতে পারতাম! ওদের সঙ্গে দেখা হলে জড়িয়ে ধরতাম!’

আরও পড়ুন