মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

রবি ঠাকুর যেন যথার্থই বলেছেন, ‘মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে...।’

সেই কবে, ৩৮ বছর আগে আম্মা এই পৃথিবীর মায়া ত‍্যাগ করেছেন। কিন্তু ফরিদপুরের ঝিলটুলিতে ‘আমেনা মঞ্জিল’-এর আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে আম্মাকে নিয়ে কত কথা, কত ঘটনা।

আমাদের বাড়িভর্তি ছিল হাঁস, মুরগি আর ছাগল। শুনেছি স্বাধীনতার আগে আমাদের বাসায় খোপভরা কবুতরও ছিল। স্বাধীনতার কয়েক বছর পরেও আমার শৈশবে কবুতরের খোপটা আমেনা মঞ্জিলের আদি বিল্ডিংয়ের বারান্দার ওপরে লাগানো দেখেছি। কিন্তু কোনো কবুতর দেখিনি। আম্মা কবুতর পালতে দিতেন না। আম্মাকে সব সময় বলতে শুনেছি, ‘কবুতর হচ্ছে সুসময়ের বন্ধু। কোনো বিপদ দেখলে কবুতর চলে যায়।’

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আমার বড় ভাই নাসিম দাদা (বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী সালাহ্উদ্দিন) শহীদ হওয়ার আগে আমাদের সব কবুতর উড়ে কোথায় যেন চলে গিয়েছিল। সে কারণে আম্মা কবুতর পছন্দ করতেন না।

বাড়ির উঠানে প্রায় সারা বছরই দেখতাম ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুলতুলে নরম বাচ্চাগুলোকে ধরতে গেলে মা মুরগি ঠোকর দিতে আসত। আমাদের সকালের নাশতার ডিমের উৎস ছিল এসব মুরগির ডিম। আম্মার মুরগিগুলো সারা উঠানে ঘুরে বেড়াত।

অনেকগুলো ধবধবে সাদা রঙের হাঁস ছিল। সকালে খোপ থেকে বের হয়ে প্যাক প্যাক করতে করতে পুকুরে নামত। প্রথমে দুটি হাঁস ছিল, তারপর বাচ্চা ফুটিয়ে হাঁসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৪। হাঁসগুলো পুকুরের পাড়ে ঝোপের আড়ালে ডিম পেড়ে তা দিত। আমাদের গৃহকর্মী মেয়েটা বেশ কয়েকবার পুকুরের পাড় থেকে হাঁসের ডিম উদ্ধার করেছে। হাঁসগুলোকে শামুক খাওয়াতে হতো। বর্ষাকালে বাড়ির পেছনের বিস্তীর্ণ ধানখেতে যখন পানি উঠে বিলে পরিণত হতো, তখন সেখান থেকে শামুক আনতে যেত। একবার আমিও চুপিসারে বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে শামুক আনতে গিয়েছিলাম। পানি আর কাদার মধ্যে খুব ভয় লাগছিল, আবার ভালোও লাগছিল।

কে একজন আম্মাকে বলেছিল একদম সাদা প্রাণী ঘরে থাকলে অমঙ্গল হয়। এ কথা শোনার পর আম্মা সব হাঁস জবাই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রতিদিন দুটি করে হাঁস রান্না করা হতো। তখনো পোষা প্রাণীর প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মায়নি, তাই তেমন মায়া লাগেনি। এখন মনে হলে কষ্ট হয়। তখন বরং হাঁসের মাংসের লোভে স্কুল থেকে ফিরে বিনা বাক‍্য ব‍্যয়ে ভাত খেতে বসে যেতাম।

আম্মার একটা কালো রঙের ছাগল ছিল। অনেক ছোটবেলায় আমি একবার এই ছাগলের বাচ্চা হওয়া দেখেছিলাম। আমাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমি একবার তাকিয়ে বাচ্চাটা বের হওয়ার দৃশ্যটা দেখেছিলাম। ভয়াবহ কষ্টের এই দৃশ্য আমাকে বহুদিন বিষণ্ন করেছে। ছাগলটি বেশ অনেকটা দুধ দিত; কিন্তু কেউ সেই দুধ খেত না। সবার কাছে গন্ধ লাগত। শুধু আমি সেই দুধ খেতাম। আম্মা বলতেন, ‘ছাগলের দুধ খেলে ব্রেন ভালো হয়।’

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]

আম্মা নিজে খুব চা খেতেন, ছাগলটাকেও চা খাওয়ানোর অভ্যাস করেছিলেন। ছাগলটি সারা দিন মাঠে চরে খেত, সন্ধ্যা হলে একাই বাসায় ফিরে আসত। সে বছর বন্যার শুরুতে একদিন বিকেলে ছাগলটা ঘরে ফিরল না। আশপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। আম্মা খুব মন খারাপ করলেন।

আট দিন পর একদিন দুপুরে ফিরে এল। আমরা আমাদের ছাগল দেখেই চিনলাম। তারপর আম্মা এক কাপ দুধ–চা বানিয়ে ওর মুখের সামনে ধরল। ও চুক চুক করে খেয়ে ফেলল।

আমাদের বাড়িতে একটা বিড়ালও ছিল। সাদা–কালো রঙের বিড়ালটা আম্মার পায়ে-পায়ে ঘুরত। আম্মা বলতেন, ‘বিড়াল কোনো খাবারে মুখ দিলে সেই খাবার খেলে অসুখ হয়। বিড়ালের লোম পেটে গেলে ডিপথেরিয়া হয়।’ তারপরও কেন যেন এই বিড়ালটাকে আম্মা খুব ভালোবাসতেন। বিড়ালটা কিন্তু লক্ষ্মী ছিল। সারা দিন বাইরে বাইরে ঘুরত। ঠিক খাওয়ার সময় আম্মার পায়ের কাছে এসে মিউ মিউ করত। খাবার দিলে খেয়ে আবার বাইরে চলে যেত।

একদিন আম্মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার দেখানোর জন্য গেলেন ঢাকায় বড় আপার বাসায়। আম্মা যেদিন ঢাকায় গেলেন, সেদিন থেকে বিড়ালটা আর আমাদের বাসায় আসে না। আমরাও বিড়ালের কোনো খোঁজখবর নিলাম না।

আম্মা চিকিৎসা শেষে মাসখানেক পর বাসায় ফিরে এলেন। আশ্চর্যজনকভাবে বিড়ালটা ঠিক ওই দিনই এসে হাজির হলো। আম্মা বারান্দার চেয়ারে বসে ছিলেন, বিড়ালটা পুকুরের দিকের গেট দিয়ে নিঃশব্দে ঢুকে আম্মার পায়ের কাছে বসে মিউ মিউ করতে লাগল। আমরা সবাই অবাক। বিড়ালটা হয়তো বহু দূর থেকে তার প্রিয়জনের গায়ের ঘ্রাণ পেয়েছিল।

এর বছরখানেক পর আম্মা ক্যানসারে মারা গেলেন। এরপর আর কোনো দিন ওই বিড়ালের দেখা পাইনি।