সড়কে অটোরিকশার বিশৃঙ্খলা নিয়ে বিরক্তি, শেষে বানালেন ‘বাপের রাস্তা’
ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা, একটানা হর্ন বাজানো কিংবা অন্য যানবাহন ও পথচারীদের ঝুঁকিতে ফেলার ঘটনা নতুন নয়। এসব দৃশ্য এবার উঠে এসেছে একটি গেমে। নাম ‘বাপের রাস্তা’।
এখানে অটোরিকশাচালকের ভূমিকায় থাকা খেলোয়াড় ইচ্ছেমতো ধাক্কা দিতে পারেন, উল্টো পথে চালাতে পারেন গাড়ি। তবে বিপত্তি বাধে যখন ক্ষুব্ধ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে তাড়া করে। ধরা পড়লেই গণধোলাই, শেষ হয় খেলা।
গেমটি তৈরি করেছেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী ওমর ফারুক রিয়াদ। গেমটির ধারণা এসেছে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। তাঁর বাসা মহাখালীতে, অফিস মিরপুরে। প্রতিদিন যাতায়াতের পথে ঢাকার সড়কে অটোরিকশার নানা অনিয়ম দেখতে হয় তাঁকে। সেই অভিজ্ঞতাই গেমটি তৈরির প্রেরণা জুগিয়েছে। গুগল এনালিটিক্সের তথ্য বলছে, গত শুক্র ও গতকাল শনিবার দুই দিনে গেমটি এক লাখের বেশিবার খেলা হয়েছে।
দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি কোনো দপ্তরে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারও কারও মতে, রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ হতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রম ঢিলেঢালা হয়ে পড়ার সুযোগে রাজধানীর সব সড়কে চলাচল শুরু করে রিকশা। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের ‘ব্রেকিং সিস্টেম’ নিরাপদ কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। চালকদের প্রশিক্ষণ নেই। ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা ব্যাপক। ফলে সড়কে দুর্ঘটনা ও যানজট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, অটোরিকশাচালকদের উল্টো পথে চলা, একটানা হর্ন বাজানো কিংবা পথচারীদের ঝুঁকিতে ফেলার ঘটনা প্রতিদিনই চোখে পড়ে। এসব বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা থেকেই গেম তৈরির ধারণা তাঁর মাথায় আসে। তিনি বলেন, ‘অটোরিকশাচালকদের প্রতি আমার কোনো বিরূপ মনোভাব নেই। আমি শুধু মনে করি, অটোরিকশা চলাচলে যথাযথ নিয়মকানুন থাকা উচিত এবং কোনো অনিয়ম হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।’
ধাক্কা, হর্ন আর গণপিটুনি
গেমটি খেলতে আলাদা কোনো অ্যাপ ইনস্টল করতে হয় না। ওয়েবসাইটে ঢুকে ‘রাস্তায় নামুন’ লেখায় চাপ দিলেই শুরু হয় খেলা। খেলোয়াড়কে নিতে হয় একজন অটোরিকশাচালকের ভূমিকা। এরপর ঢাকার সড়কে শুরু হয় তাঁর যাত্রা।
গেমে সামনে থাকা পথচারী কিংবা অন্য যানবাহনকে ধাক্কা দেওয়া যায়। প্রতিটি ধাক্কায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়। যত বেশি বিশৃঙ্খলা, তত বাড়ে ‘জাতীয় ক্ষতি’র পয়েন্ট। তবে পরিণতিও আছে। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ মানুষ অটোরিকশার পেছনে ধাওয়া করে। তারা চালককে ধরে ফেললে শুরু হয় গণধোলাই। তখনই শেষ হয়ে যায় খেলা।
গেমে হর্ন বাজানোর পাশাপাশি আছে ‘শব্দ বোমা’ নামের একটি অপশন। এতে চাপ দিলে শোনা যায় ‘খাইছি তোরে’ কিংবা ‘সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিমু’র মতো ব্যঙ্গাত্মক সংলাপ। এসব সংলাপ, সড়কের বিশৃঙ্খলা আর মানুষের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ঢাকার পরিচিত এক বাস্তবতার হাস্যরসাত্মক রূপ।
খেলা শেষে ‘দৈনিক যানজট’ নামে একটি কাল্পনিক পত্রিকায় উঠে আসে খেলোয়াড়ের কীর্তি। সেখানে ‘ধাক্কা দিয়ে গণধোলাই খেলেন অটোরিকশাচালক’-এর মতো শিরোনাম দেখা যায়। খেলার ফলাফলকে এভাবে সংবাদ শিরোনামে তুলে ধরাও গেমটির অন্যতম আকর্ষণ।
আছে ঢাকার চিরচেনা পরিবেশ
ওমর ফারুক রিয়াদের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। তিনি পড়াশোনা করেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন।
ওমর ফারুক জানান, গেমটি তৈরিতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে। এটি তৈরিতে কোনো তৈরি গেম ইঞ্জিন ব্যবহার করেননি তিনি। জাভাস্ক্রিপ্ট, এইচটিএমএল ও সিএসএস দিয়ে পুরো তৈরি করা হয়েছে। ত্রিমাত্রিক দৃশ্য তৈরিতে ব্যবহার করেছেন থ্রি.জেএস প্রযুক্তি। গেমটির রাস্তা, দালান ও রিকশাচিত্রও কোডের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। গেমটির নকশায় ঢাকার পরিচিত পরিবেশও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। এতে আছে রিকশাচিত্র, ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা ছবি, শহীদ মিনার, শাহবাগের ফুলের দোকান এবং আনন্দ সিনেমা হলের মতো পরিচিত স্থাপনা। গেমে ঢাকার একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রও রয়েছে।
শুধু সড়কের বিশৃঙ্খলাই নয়, গেমে রাখা হয়েছে শহরের কিছু পরিচিত সমস্যার ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন। যেমন অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার বিষয়টি। আবার গণধোলাই থেকে বাঁচতে পুলিশকে ‘চা-পানি’ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব উপাদান ঢাকার সড়ক জীবনের নানা অসংগতি নিয়ে কৌতুক তৈরি করে।
সামাজিকমাধ্যমে সাড়া
প্রথমে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এটি শেয়ার করেন ওমর ফারুক। পরে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে প্রকাশ করেন। এরপর অল্প সময়েই গেমটি ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে গেমটির প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ ফেসবুক ও ইউটিউবে সরাসরি খেলার ভিডিও প্রচার করেছেন। আবার নতুন কী কী বিষয় যোগ করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে।
সিদ্দিক সাজ্জাদ নামে একজন ব্যবহারকারী ফেসবুকে গেমটি শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘গেমটি ফেসবুকে পেয়েছি এবং কোনোভাবেই খেলা থামাতে পারছি না।’ পুজা মজুমদার নামে আরেকজন গেমটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘টেসলা ড্রাইভার হলে আসলেই সবাইকে উড়ায়ে দিতে মন চায়।’ সেখানে তন্ময় দে নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘খুবই মজার গেম। এ রকম আরও দরকার।’
‘বাপের রাস্তা’ গেমের পরিসর আরও বাড়াতে চান ওমর ফারুক। ভবিষ্যতে একাধিক খেলোয়াড় একসঙ্গে খেলতে পারবেন—এমন সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দৈনন্দিন জীবনে কিছু সমস্যা দেখে মানুষ বিরক্ত হয়। পরে একসময় সেগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পরিচিত সেই অস্বস্তিগুলোকে হাস্যরসের মাধ্যমে গেম বানিয়ে সামনে আনতে চাই।
সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে
অর্থনীতিতে যখন আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয় না, তখন মানুষ জীবনধারণের তাগিদে বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যেমন: রিকশাচালনা, হকারি, দিনমজুরি ইত্যাদির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
‘বাপের রাস্তা’ গেমটিতে অটোরিকশাচালকের বিশৃঙ্খল আচরণের পর তাঁকে ধাওয়া করে ধরে মারধরের যে চিত্র দেখানো হয়েছে, তা সমাজে সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, সড়কে অটোরিকশাচালকদের অনিয়মের পেছনে তাঁদের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও জবাবদিহির ঘাটতির মতো বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। ফলে সমস্যাটিকে শুধু চালকদের ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এর পেছনের কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, গেমটিতে শুধু সড়কের বিশৃঙ্খলাকে ব্যঙ্গ করা হয়নি, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল একটি শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে শ্রেণিবিদ্বেষ ও নৈরাজ্যকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, আইনের শাসন দুর্বল হলে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো গেমে অপরাধের পরিণতি হিসেবে আইনগত ব্যবস্থার বদলে গণধোলাই দেখানো হলে তা মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, যাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অপরাধপ্রবণতা রয়েছে, তাঁরা এ ধরনের উপস্থাপনা থেকে অপরাধের প্রতি একধরনের প্রণোদনা পেতে পারেন।
তবে সড়কে চলাচলে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলার কারণে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, সেটাও এই গেমের একটা বাস্তবতা বলে মনে করেন অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী।