আলোচনায় জুলিয়ান ফ্রান্সিস
একাত্তরে শরণার্থীশিবিরে হিন্দু-মুসলমানদের সম্প্রীতি ছিল অত্যন্ত গভীর
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীশিবিরে দেশের হিন্দু–মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল অত্যন্ত গভীর। হিন্দু-মুসলিম শরণার্থীরা ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের উৎসবে অংশ হতেন এবং একত্রে থাকার প্রত্যয়ে ছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকা কাটাতে তাঁদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও গভীর সামাজিক বন্ধন আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিচারণা করে কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সম্মাননা’ খেতাবে ভূষিত জুলিয়ান ফ্রান্সিস।
আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত এক প্যানেল আলোচনায় এ কথা বলেন জুলিয়ান ফ্রান্সিস। বিকেল চারটায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘রিমেম্বারিং দ্য ১৯৭১ জেনোসাইড: মেমোরি, ডিনায়াল অ্যান্ড লেসনস’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযানের নামে চালানো গণহত্যার ওপর আন্তর্জাতিক তিন বিশেষজ্ঞের দেওয়া বক্তৃতার ওপর এ বই লেখা হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
ওই তিন বক্তা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেগরি এইচ স্ট্যান্টন, ইন্দোনেশিয়ার ব্যারিস্টার প্যাট্রিক বার্গেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের এলিসা ভন জোয়েডেন-ফোরজি। তাঁরা ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় গণহত্যা দিবসে গণহত্যার শিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্মরণ করার পাশাপাশি বিশ্বে এমন সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন, তিনি যখন ভারতের জলপাইগুড়িতে একটি শরণার্থীশিবিরে লোক নিচ্ছিলেন, তখন ভারত সরকারের ক্যাম্প ইনচার্জ বলছিলেন, মুসলমানেরা ওই দিকে, হিন্দুরা ওই দিকে। তখন আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী একজন মুসলিম ব্যক্তি বললেন, ‘আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি। গত কয়েক দিনে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো ভাগ করে নিয়েছি। আমরা এখন আলাদা হতে চাচ্ছি না। আমরা মুসলিম এবং হিন্দুদের মধ্যে আলাদা হতে যাচ্ছি না।’
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আরও স্মৃতিচারণা করেন বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের সাক্ষী জুলিয়ান ফ্রান্সিস। তিনি বলেন, যুদ্ধের পুরো ৯ মাস যখন পূজার সময় হতো তখন মুসলমানেরা নিশ্চিত করত যেন হিন্দুরা বিশেষ কিছু পায়, সেটা যত সামান্য হোক না কেন। আবার ঈদের সময় হিন্দু ও ক্যাথলিক চার্চ থেকেও মুসলমানদের বিশেষ খাবারের প্যাকেট বা কিছু মিষ্টির আয়োজন করতে দেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন, ‘হিন্দু–মুসলমানের সম্প্রীতির এমন অনেক কিছু আছে, যা মানুষের জানা ও মনে রাখা প্রয়োজন। এসবের অনেক কিছুই ছাপানো অক্ষরে আছে এবং অনেক কিছুই ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রে ধারণ করা আছে।’
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। তিনি বলেন, একাত্তরের এ দিনটিকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিশেষভাবে স্মরণ করে। এই স্মরণের একটি বড় দিক ছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে নানাভাবে গবেষণায় উৎসাহিত করা এবং এই গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য দেশে এবং দেশের বাইরে বিশেষভাবে কাজ করা।
নতুন বইটি দেশের নবীন গবেষক ও তরুণ প্রজন্মের কাজে লাগবে উল্লেখ করে মফিদুল হক বলেন, ‘একাত্তরের গণহত্যাকে আমরা বারবার স্মরণ করব। তার নানা দিক ও মাত্রা বোঝার চেষ্টা করব। বিশ্ববাসীর সামনেও তা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য নানাভাবে কাজ করব। আমরা চাই, এমন নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো না হয়।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গবেষণা সহযোগী মেহজাবিন নাজরানার সভাপতিত্বে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন তরুণ গবেষকেরা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উপল আদিত্য বলেন, সম্প্রতি ১৯৭১ সালের ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগকে ভুলে যাওয়া বা অস্বীকারের যে প্রবণতা, সেটিকে ‘ডিনায়াল’ বা অস্বীকার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন গ্রেগরি এইচ স্ট্যান্টন। একই সঙ্গে এই অস্বীকারকে ‘ডাবল কিলিং’ (দুইবার হত্যা) আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা ও আর্মেনিয়ার উদাহরণ টেনে উপল আদিত্য বলেন, অতীত গণহত্যাগুলো সঠিকভাবে স্বীকৃত হলে নতুনের পুনরাবৃত্তি ঘটত না। তাই গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল স্লোগান নয়, বরং দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।
প্যাট্রিক বারজেসের বক্তব্যের ওপর আলোচনা করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আমেনা জাহান। তিনি বলেন, কেবল তথ্য বা পরিসংখ্যান নয়, বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্পগুলো মানুষের হৃদয়ে বেশি দাগ কাটে।
এলিসা ভন জোয়েডেন-ফোরজির বক্তব্যের ওপর আলোচনা করেন ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের গবেষক মো. রিয়াদ হোসাইন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা কেবল ভুক্তভোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চারিত হয়। এটাকে ‘ইন্টারজেনারেশনাল ট্রমা’ বলা হয়। এই মানসিক ক্ষত থেকে মুক্তির প্রধান উপায় হলো গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে ভুক্তভোগীরা একধরনের মানসিক প্রশান্তি পায়।
প্যানেল আলোচনা শেষে সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশিত হয়। সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন যথাক্রমে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী ও মুক্তধারা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের শিল্পীরা। এ ছাড়া সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় জাদুঘরের শিখা চিরঅম্লান প্রাঙ্গণে কালরাত্রি স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়।