ইস্পাহানি পার্বণ নবান্ন উৎসব: নদীর পাড়ে শীতের হাওয়ায় গানের সুর, পিঠার সুবাস

জারি-সারি-লালন-গাজীর গান আর পায়েস-পিঠাপুলির আয়োজন নিয়ে শুরু হয়েছে ‘ইস্পাহানি পার্বণ নবান্ন উৎসব’ছবি: দীপু মালাকার

কালীগঙ্গা নদীতে তেমন স্রোত নেই। পানির ধারাও ক্ষীণ। শীতের ঠান্ডা হাওয়া ছুটে আসছে নদীর বুক ছুঁয়ে। পূর্ব পাড়ে শর্ষেখেতের হলুদ বিস্তার। পশ্চিম পাশের ঢালু পাড় দিয়ে ভুট্টা, তামাক ও শীতের হরেক রকম সবজির আবাদ। নদীর পাড় থেকে ভেসে আসছে জারি গানের মেঠো সুর ‘শুনিলে সাঁই বারাম খানা…’।

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোর ইউনিয়নের সাইনজুরি গ্রামের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে গেছে এই কালীগঙ্গা নদী। আজ বৃহস্পতিবার পৌষের শীতের সকালে এখানে জারি-সারি-লালন-গাজীর গান আর পায়েস-পিঠাপুলির আয়োজন নিয়ে শুরু হয়েছে ‘ইস্পাহানি পার্বণ নবান্ন উৎসব’। সারা দিনের এই আয়োজন করেছে প্রথম আলো ডটকম।

নবান্ন উৎসবে চলছে ধুন্ধুমার পিঠা তৈরি
ছবি: দীপু মালাকার

বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান লোকসংগীতের দীর্ঘকালের ঐতিহ্য রয়েছে মানিকগঞ্জে। পাশাপাশি এখানকার পিঠাপুলিরও রয়েছে বিশেষ প্রসিদ্ধি। এই ঐতিহ্যকে স্মরণ করে একেবারে প্রাকৃতিক পরিবেশে এখানে দেশের অন্যতম ঋতুভিত্তিক নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

নদীর কিনার থেকেই সারি সারি চেয়ার পাতা। পাড়ের খানিকটা ওপরে পূর্ব দিকে মুখ করা মঞ্চ। উত্তর পাশে  কৃষি ও স্থানীয় কারুপণ্যের পসরা। স্টলগুলোয় সাজিয়ে রাখা হয়েছে খেত থেকে তুলে আনা টাটকা শালগম, গাজর, কপি, শিমসহ হরেক রকম মৌসুমি সবজি। কৃষকেরাও এসেছেন লাঙল-জোয়াল নিয়ে। এরপরের স্টলগুলোয় রয়েছে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, মাটির হাঁড়ি–পাতিল, হরেক রকম পুতুল ইত্যাদি।

আর দক্ষিণে বসেছে খাজা, গজা, বাতাসা, চিনির ছাঁচ, মোয়া-মুড়িসহ হরেক রকম গ্রামীণ মিঠাইয়ের পসরা। পাশেই আছে নাগরদোলা।

ইস্পাহানির ব্র্যান্ড ‘পার্বণ চাল’ দিয়ে হরেক রকম পিঠা আর পায়েস তৈরি হচ্ছে মঞ্চের পাশের ছাউনিতে। বাতাস বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার সুবাস। দর্শক আর অতিথিদের জন্য শীতের সকালে পিঠাপুলির সঙ্গে ছিল ইস্পাহানির ধোঁয়া ওঠা গরম চা।

সকালে উৎসবের উদ্বোধন করেন ঘিওর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহম্মেদ। তিনি বলেন, ‘মানিকগঞ্জ কৃষিনির্ভর এলাকা। কৃষি ছাড়া এই এলাকার লোকসংগীত ও পিঠার সুনাম রয়েছে সারা দেশে। প্রথমবারের মতো এই গ্রামীণ পরিবেশে নবান্ন উৎসব করায় আমরা খুব আনন্দিত।’

ইস্পাহানি লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফজলে রাব্বি বলেন, ‘এখন ধান কাটা প্রায় শেষ। এ সময় সারা দেশেই বহু প্রাচীনকাল থেকে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। আমরা এই আয়োজনের মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসবে যুক্ত হতে চাই। মানুষের হৃদয়ে স্থান পেতে চাই।’

স্টলগুলোয় সাজিয়ে রাখা হয়েছে খেত থেকে তুলে আনা হরেক রকম মৌসুমি সবজি
ছবি: দীপু মালাকার

ইস্পাহানির চায়ের পরিচিতি নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। চা–অনুরাগীদের বিপুল জনপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠান এখন চায়ের পাশাপাশি চাল আর শর্ষের তেলও নিয়ে এসেছে বাজারে। ‘পার্বণ’ নামে তাদের ‘চিনিগুঁড়া’, ‘কালিজিরা’, ‘তুলসিমালা’—এই ৩ রকম সুগন্ধী চালসহ রয়েছে ৯ ধরনের ভাতের চাল। এ বছর থেকে তারা চালের সঙ্গে শর্ষের তেলও বাজারজাত করছে ‘পার্বণ’ নামেই।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে দেওয়ান সালেক ও তাঁর দল পরিবেশন করে গাজীর গান। এরপর খন্দকার উজ্জ্বলের পরিচালনায় বৈঠকি জারি গান নিয়ে মঞ্চে আসেন আবদুল মান্নান বয়াতি।

এর মধ্যেই গানে গানে বেলা উঠে গেছে মধ্যগগনে। তাই মধ্যাহ্ন বিরতি চলছে এখন অনুষ্ঠানে।

শীর্ণ হয়ে আসা কালীগঙ্গার পাড়ে শুরু হয়েছে ‘ইস্পাহানি পার্বণ নবান্ন উৎসব’
ছবি: দীপু মালাকার

বিকেলে মৌসুমী মৌয়ের সঞ্চালনায় শুরু হবে জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বক্তব্য দেবেন কথাশিল্পী ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নেবেন অভিনয়শিল্পী মীর সাব্বির। গান করবেন ‘আইলা রে নয়া দামান’খ্যাত শিল্পী তাসিবা।

স্ট্যান্ডআপ কমেডি করবেন শাওন মজুমদার। আর স্থানীয় লোকশিল্পীদের গান তো থাকবেই। আরও থাকবে কুইজ ও গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর বিজয়ীদর মধ্যে পুরস্কার বিতরণী।