পরিবেশসচেতন প্রজন্ম গড়ার অঙ্গীকারে শেষ হলো ‘গ্রিন জেনেসিস’ উৎসব

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত গ্রিন জেনেসিস উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে উৎসাহিত করা।

‘গ্রিন জেনেসিস ২০২৬’ উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে আয়োজক ও অতিথিদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে বিজয়ী শিক্ষার্থীরা। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ঢাকা, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ছবি: ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আউটরিচ টিমের সৌজন্যে

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে আয়োজিত চার দিনব্যাপী জাতীয় পরিবেশ উৎসব ‘গ্রিন জেনেসিস ২০২৬’ শেষে হয়েছে। পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁদের নতুন ধারণা, উদ্ভাবনী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা তুলে ধরার জন্য একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়। পাশাপাশি পরিবেশসচেতন প্রজন্ম গড়ার অঙ্গীকার করা হয়।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। ৮ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আউটরিচ টিমের আয়োজনে এই উৎসবে ছিল বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী, কর্মশালা ও আলোচনা। এসবের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ নিয়ে নিজেদের ভাবনা প্রকাশের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানও উপস্থাপন করেন।

আয়োজকেরা জানান, প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী এ আয়োজনে নিবন্ধন করেন। ১২টি বিভাগে জমা পড়ে সাড়ে তিন হাজারের বেশি আবেদন। দেশের প্রায় ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৫৩টি প্রতিষ্ঠানের ৮৮টি ক্লাব এবং বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধি এতে অংশ নেন।

উৎসবের প্রথম দিন শুরু হয় ‘আ লেটার টু নেচার’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির উদ্দেশে নিজেদের ভাবনা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশা তুলে ধরে চিঠি লেখেন। প্রকৃতির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে তাঁদের চিন্তাভাবনা উঠে আসে এই পর্বে।

‘ইকো ডিকোড’ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অঝরা ইসলাম এবং আবদুল্লাহ ইসলাম (টিম ‘গো বিগ গ্রিনস’)। তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আয়োজকেরা
ছবি: ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আউটরিচ টিমের সৌজন্যে

দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ক্লাইমেট সায়েন্স অলিম্পিয়াড’ এবং ‘ক্লাইমেট ওরেটরি’। জলবায়ুবিজ্ঞান, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞান যাচাই করা হয় অলিম্পিয়াডে। অন্যদিকে ক্লাইমেট ওরেটরিতে তরুণেরা জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে তাৎক্ষণিক বক্তব্য উপস্থাপন করে নিজেদের বিশ্লেষণী দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রদর্শন করেন।

তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্রিন জেনেসিস ইনস্পিরেশন’ শীর্ষক বিশেষ অধিবেশন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিথ্রিইআর পরিচালক গোলাম রব্বানী। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট লাইফের প্রধান তাহসিনা রহমান শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং এ ক্ষেত্রে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।

এদিন আরও অনুষ্ঠিত হয় এনভায়রনমেন্টাল প্রজেক্ট ডিসপ্লে, ইকো ডিকোড প্রবলেম-সলভিং চ্যালেঞ্জ, পোস্টার ডিজাইন, ওয়াল ম্যাগাজিন, ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী, এআই আর্ট, এনভায়রনমেন্টাল রিল, গ্রিন জার্নালিজমসহ বিভিন্ন সেগমেন্ট। অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, টেকসই সমাধান, গবেষণা, সৃজনশীল যোগাযোগ এবং পরিবেশবিষয়ক গল্প বলার নতুন নতুন ধারণা উপস্থাপন করেন। এসব আয়োজনের মাধ্যমে তরুণেরা শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই থেমে থাকেননি, তাঁরা এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়েও কাজ করেছেন।

উৎসবজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের জন্য পাঁচটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালাগুলো পরিচালনা করেন সিথ্রিইআরের ডিরেক্টর গোলাম রব্বানী, অফিস অব কমিউনিকেশনসের ডিরেক্টর খায়রুল বাশার, প্রথম আলোর ডিজিটাল কনটেন্ট লিড ও লেখক খায়রুল বাবুই, সিথ্রিইআরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর শারমিন নাহার এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অ্যালামনাই সৃজন বণিক। এসব কর্মশালায় পরিবেশবিষয়ক যোগাযোগ, গবেষণা, সাংবাদিকতা, জনসচেতনতা তৈরি এবং কার্যকর ও সৃজনশীল উপস্থাপনার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরা হয়।

উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত। পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তরুণদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতের টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং সচেতনতার সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। আর সেই যাত্রায় তরুণেরাই সবচেয়ে বড় শক্তি।’ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার আরিফুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডেভিড ডাউল্যান্ড। সমাপনী বক্তব্য দেন আউটরিচ টিমের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর দীপ্তি সরকার। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে সাফল্য অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার, সনদ ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

চার দিনব্যাপী তারুণ্যের এই উৎসবে সহযোগী ছিল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিথ্রিইআর) এবং ইয়ুথ ফর আ গ্রিন আর্থ (ওয়াইজিই)। সহ–আয়োজক ছিল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম, এনভায়রনমেন্টাল ক্লাব, কমিউনিটি সার্ভিস ক্লাব এবং ন্যাচারাল সায়েন্স ক্লাব। পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এসিআই মোটরস। ডিজিটাল পার্টনার হিসেবে ছিল প্রথম আলো ডটকম।