আলী চাচার ঝালমুড়ি
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
সালটা ১৯৯৫। তখনকার মিরপুর আজকের মতো এতটা ঘিঞ্জি আর চঞ্চল ছিল না। রাজপথে গাড়ি ছিল, হর্ন ছিল, পথচারী ছিল। তবে সবকিছুর আড়ালেই যেন এক অচেনা স্থিরতা ও শান্তভাব লেগে থাকত। সে সময় মিরপুরের প্রাণকেন্দ্র ছিল পূরবী সিনেমা হল।
সিনেমার টিকিটের লাইনের মতোই সমান জাঁকজমক ছিল হলের বাইরের চত্বরটা। চা, গরম–গরম শিঙাড়া, সমুচা, বাদাম আর চানাচুরের মেলা বসত সেখানে। তবে এত সব আয়োজনের মাঝেও একজনের দোকান ছিল একদমই আলাদা। তিনি আলী চাচা, আর তাঁর নামকরা ঝালমুড়ি।
তখন আমি বেশ ছোট। চারপাশের জটিল জগৎ বোঝার বয়স তখনো হয়নি; কিন্তু জিবের স্বাদ চিনতে তো বয়স লাগে না! আলী চাচার টিনের বাটিতে ঝালমুড়ি মাখার অদ্ভুত এক কায়দা ছিল। একটা নিজস্ব লয় ছিল তাঁর হাতের দোলায়; যেন মুড়ি মাখছেন না, কোনো ধ্রুপদি বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলছেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, হুবহু একই উপকরণ দিয়ে অন্য কেউ বানালে সেই জাদুকরি স্বাদ আর মিলত না। তখন অবশ্য এসব তত্ত্ব বুঝতাম না। পড়ি মোটে ক্লাস সিক্সে। শুধু জানতাম, পূরবী সিনেমা হল চত্বরে এলে আলী চাচার ঝালমুড়ি খাওয়া চাই! মুড়ির সঙ্গে কী কী দিতেন, আজ এত বছর পর সবকিছুর নাম আর মনে নেই।
আমাদের জীবনের চাকা দ্রুত ঘুরতে শুরু করল। মিরপুরেই আমাদের স্কুল ও কলেজজীবন শেষ হলো।
ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল পুরো মিরপুর। শহরের মধ্যে থেকেও প্রকৃতি, ফাঁকা জায়গা আর নিরিবিলি পরিবেশের যে স্বাদ পাওয়া যেত; তা একটু একটু করে কমে আসতে লাগল। দ্রুত বদলে যাওয়া মিরপুরের শুরুটা তখন চোখের সামনে দেখা যাচ্ছিল। আগের সেই জমজমাট পূরবী সিনেমা হলও একসময় আড়ালে চলে গেল। নিভে গেল তার রাজকীয় রূপ। নতুন নতুন সিনেমার পোস্টার নেই। টিকিট কেটে আর মানুষের অপেক্ষাও নেই।
সেই সঙ্গে বদলালাম আমিও। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একদিন চাকরিজীবনে প্রবেশ করলাম তড়িৎ প্রকৌশলী এই আমি। বাবার হাত ধরে শৈশব-কৈশোরে পল্লবী এলাকায় ঘুরে বেড়ানো আমিও একদিন বাবা হলাম।
২.
এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। এক অলস দুপুরে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ছেলেকে নিয়ে পূরবীর দিকে পা বাড়ালাম। কোনো তাড়া ছিল না, কোনো কাজও ছিল না। আসলে জীবনের একটা পর্যায়ে পৌঁছে মানুষ নিজের শৈশবের আঁতুড়ঘরগুলোকে নতুন করে খুঁজতে শুরু করে। দেখতে চায় যে পথে সে একদিন দৌড়েছিল, সেই ধূলিকণাগুলো কি আজও তাকে মনে রেখেছে?
ঠিক তখনই অলৌকিকের মতো তাঁকে দেখলাম।
আলী চাচা!
আশির কোঠা পার করা শরীর, সাদা দাড়ি। শরীরটা যেন নুয়ে পড়েছে। কিন্তু দূর থেকে সেই হাতের ভঙ্গিটা চিনতে আমার এক সেকেন্ডও ভুল হলো না। সেই একই ছন্দময় হাত, একইভাবে টিনের পাত্রে মুড়ি মেখে যাচ্ছেন। কত বছর পর তাঁকে দেখলাম।
আমি কাছে গিয়ে ছেলেকে বললাম, এই ঝালমুড়িটা খেয়ে দেখো। আলী চাচা আমার কথা শুনে স্নেহের হাসি হেসে বললেন, ‘বাবা, বানাইয়া দিই।’
‘বাবা’ ডাকটা কানে যেতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। শৈশব-কৈশোরে তিনি হয়তো আমাকেও এভাবেই ডাকতেন। আগের নিয়মে বাটিতে মুড়ি আর মসলা মেশাতে লাগলেন, আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, সময়ের ঘড়ি পেছনে চলে গেছে। আবার ফিরে এসেছে আমাদের কিশোরবেলা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা, আমাকে মনে আছে?’ তিনি একটু তাকিয়ে থেকে হাসলেন। বললেন, ‘মনে থাকবে না কেন, বাবা?’
ঝালমুড়িতে প্রথম কামড়টা দিয়েই ছেলে বলে উঠল, ‘বাবা, সত্যি অনেক মজা!’
আমার চোখের সামনে সেই আগের মিরপুর ফিরে এল। সেই পূরবী সিনেমা হল, টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ মানুষ আর সামনের চত্বরে সেই আলী চাচা।
চোখের কোণে পানি জমে উঠল। ঝাপসা চোখ দুটো আড়াল করতে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে বসে ছেলে আবার বায়না ধরল, ‘বাবা, কাল আবার আলী চাচার কাছ থেকে ঝালমুড়ি খাব।’ আমি শুধু হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ বাবা, খাবে।’
জীবনের সব পথ কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, কিছু পথ স্মৃতির টানে শিকড়ে ফিরে আসার জন্যও তৈরি হয়। আর আলী চাচার সেই ঝালমুড়ির মতো কিছু স্বাদের কোনো দিন মেয়াদ ফুরায় না!
আশফাকুল মনির, সড়ক-১, ব্লক–এ,
পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা