অধ্যাপক নজরুল ইসলামের জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৩৯ নদীর চরে, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের এক প্রত্যন্ত এলাকায়।
নদীভাঙনের কারণে দাদা বিক্রমপুর থেকে যান চাঁদপুরে, সেখান থেকে আবার শরীয়তপুর। সেই ধারাবাহিক ভাঙন আর স্থানান্তরের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনের বোধ—ভূগোল কেবল মানচিত্র নয়, মানুষের জীবনযাত্রার নিয়ন্তা শক্তি।
‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শিরোনামের সাক্ষাৎকার সিরিজের অংশ হিসেবে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় তাঁর সঙ্গে কথা হয় ৮ জানুয়ারি ২০২৬।
ছয় বছর বয়সে তাঁরা ভেদরগঞ্জ থেকে যান ফরিদপুর। চার দিন ও চার রাতের নৌকাযাত্রা। পদ্মা বেয়ে গুনটানা নৌকা, নৌকার মধ্যেই রান্না, ঘুম, সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র। আজকের দৃষ্টিতে সেটি কষ্টের গল্প, কিন্তু তাঁর কাছে সেটি এক ‘অসাধারণ জার্নি’। সেখান থেকে ছোটবেলাতেই চলে আসেন ঢাকায়।
তাঁর শৈশব-কৈশোর কাটে পুরান ঢাকায়—ঠাটারীবাজার, নবাবপুর, কাপ্তান বাজার এলাকায়। স্কুলজীবনে তিনি পড়েছেন নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে। সেই সময় স্কুলে পড়াতে এসেছিলেন একঝাঁক তরুণ শিক্ষক—মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর, কাজী আবদুল বাসেত। ভাবতেই বিস্ময় লাগে—একজন স্কুলছাত্র তিনজন কিংবদন্তি শিল্পীর সরাসরি ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
তিনি ছিলেন ‘ফার্স্ট বয়’। ক্লাস সিক্স থেকে এই পরিচয় তাঁর মাথার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল। রেজাল্ট ভালো হতো, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত আঁকাআঁকি, লেখা আর চারপাশের জগৎ দেখার দিকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন না। জয়দেবপুরে বয়স্কাউট জাম্বুরিতে ছিলেন। তবু খবর পেয়ে পতাকা অর্ধনমিত করা, কারফিউর মধ্যে ট্রাকে করে শিশুদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া—এই স্মৃতিগুলো তাঁর কাছে একুশের আবেগকে আরও গভীর করে তোলে। পুরান ঢাকার বাসায় বসে তিনি দেখেছেন শিল্পীদের হাতে হাতে একুশের পোস্টার তৈরি হতে।
১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক, এরপর ঢাকা কলেজে আইএসসি। কলেজজীবনে এসে তিনি একটু বেপরোয়া—অঙ্কের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিউমার্কেটে আড্ডা, সাহিত্য আর শিল্পে ডুবে থাকা। তবু ফল খারাপ হয়নি। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেই বছরই তাঁর জীবনে আরেকটি বড় অভিজ্ঞতা—ইরানের তেহরানে আন্তর্জাতিক বয়স্কাউট জাম্বুরি। পাকিস্তান থেকে ৫০ জনের দলে বাঙালি ছিলেন মাত্র একজন—তিনি নিজে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈষম্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুতে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও দ্রুত বুঝলেন—এটা তাঁর জায়গা নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি ভূগোল বিভাগে এলেন। অধ্যাপক নাফিস আহমেদের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষকের কাছে পড়া, কিন্তু একই সঙ্গে অবাঙালি আধিপত্যের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন ছিল শেখার পাশাপাশি বোঝার সময়ও।
এমএতে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন—অনার্স ও এমএ মিলিয়ে বিভাগীয় অলটাইম রেকর্ড। অথচ সেই রেকর্ড ফলের পরও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাননি। এটি ছিল স্পষ্ট বৈষম্য। পরে উপাচার্য পরিবর্তনের পর নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
এরপর কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে কানাডায় পিএইচডি করতে যাওয়া। সেটা আরেক অধ্যায়। কিন্তু সেখানে তাঁর মন পড়ে থাকল আর্ট, সাহিত্য আর ঘোরাঘুরিতে। ডিগ্রি শেষ না করেই ফিরে আসেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন—এটা তাঁর গাফিলতি!
তাঁর দুই মেয়েই শিক্ষক—একজন দেশে, একজন বিদেশে। জ্ঞান আর শিক্ষার ধারাই যেন তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকার।
নগর-পরিকল্পনা নিয়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ভাবনা আজ বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান। তিনি বারবার বলেন, ঢাকাকে শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন হিসেবে দেখলে হবে না। বৃহত্তর ঢাকা—ছয় জেলার প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের জন্য আলাদা মাস্টারপ্ল্যান দরকার। দরকার উন্নয়ন ছড়িয়ে দেওয়া, নতুন স্বনির্ভর শহর। বেশ কিছু বইয়ে দিয়েছেন সেসব পরামর্শ।
ধানমন্ডি, শেরেবাংলা নগর, হাতিরঝিল—প্রতিটি জায়গা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ গভীর, কখনো অস্বস্তিকর সত্যভাষণ। তিনি মনে করেন, লুই কানের সংসদ ভবন অসাধারণ হলেও শহরের মাঝখানে এত বিশাল জমির ব্যবহার প্রশ্নহীন নয়। আবার দক্ষিণ প্লাজার মতো উন্মুক্ত স্থান না থাকলে জাতীয় জীবনের বড় সমাবেশ সম্ভব হতো না—এ কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন।
শিল্পের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক নিবিড়। জয়নুল আবেদিন তাঁর কাছে চিরশীর্ষে। কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর—এঁরা সবাই তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সংগ্রহের অংশ। শহর, শিল্প, রিকশা আর্ট—সবকিছুকে তিনি একই দৃষ্টিতে দেখেন।
শেষে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করি, বাংলাদেশ নিয়ে তিনি আশাবাদী, না হতাশ—তিনি বলেন, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ অপরাজেয়। অনেক উত্থান-পতন হবে, কিন্তু দেশ টিকে থাকবে।