সৈয়দ রেজাউল করিম সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জুরাইন কবরস্থানে দুই–তিনটা কবর খোঁড়ার পর একটা কবরে আমি তিন্নির মরদেহ শনাক্ত করি। কেরানীগঞ্জ থানায় খুনের মামলা হয়। সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। সেই খুনের মামলার ২০ বছর পার হয়েছে। তবে বিচার শেষ হয়নি। জানি না, কবে মামলার বিচার শেষ হবে।’

২০০২ সালের ১০ নভেম্বর বুড়িগঙ্গায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর নিচে তিন্নির লাশ পাওয়ার ঘটনায় কেরানীগঞ্জ থানায় খুনের মামলা হয়। এই মামলা তদন্ত করে ২০০৮ সালের ৮ নভেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভি কানাডায় পলাতক। ২০১০ সালের ১৪ জুলাই অভির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত। মডেল তিন্নী হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য বলছে, গোলাম ফারুক অভির প্ররোচনায় তিন্নি তাঁর স্বামী পিয়ালকে তালাক দেন। এরপর অভি তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে তিন্নি এসব তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অভি ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর সন্ধ্যার পর রাতের যেকোনো সময় তিন্নিকে হত্যা করেন। লাশ গুম করার জন্য গাড়িতে করে কেরানীগঞ্জ থানাধীন ১ নম্বর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর কাছে ফেলে দেন অভি।

রায়ের পর্যায় থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ

মামলার নথিপত্রের তথ্য বলছে, এই মামলায় ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর মডেল তিন্নী হত্যা মামলাটি রায়ের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে সেদিন রায় হয়নি। রায় মুলতবি রেখে আদালত সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন। তিন্নি খুনের ১৯ বছর পর আদালতে সাক্ষ্য দেন তিন্নির বাবা সৈয়দ মাহবুব করিম ও চাচা সৈয়দ রেজাউল করিম। এখন মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার সপ্তম দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) ভোলানাথ দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, মামলার রায় মুলতবি রেখে আদালত সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করছেন।

মামলার তথ্য অনুসারে, তিন্নি হত্যাকাণ্ডের পর অভি কানাডায় পালিয়ে যান। সেখান থেকে কাগজপত্র পাঠিয়ে এক আইনজীবীর মাধ্যমে মামলাটির স্থগিতাদেশ চেয়ে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। নিম্ন আদালতে চলমান মামলাটিতে অংশ নেওয়ার জন্য কানাডার বাংলাদেশ দূতাবাসে পাসপোর্ট চেয়ে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন অভির আইনজীবী। তাই ইচ্ছা থাকলেও দেশে আসতে পারছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাই তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বার্থে পাসপোর্ট পেয়ে দেশে আসা পর্যন্ত মামলাটির কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়। শুনানি শেষে ২০১১ সালের ১৫ জানুয়ারি রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এরপর ২০১১ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট মামলাটির স্থগিতাদেশ দেন। এ কারণে প্রায় ছয় বছর মামলার কার্যক্রম স্থগিত ছিল। পরে হাইকোর্টের আদেশে মামলার কার্যক্রম আবার চালু হয়।

‘অভির বিচার চাই’

তিন্নির মৃত্যুর পর বদলে যায় বাবা সৈয়দ মাহবুব করিম ও চাচা সৈয়দ রেজাউল করিমের জীবন। বিচারের আশায় শুরুর দিকে তাঁরা থানা, পুলিশ ও আদালতে আসতেন। তবে দীর্ঘদিন মামলার বিচারকাজ বন্ধ থাকার কারণে গত কয়েক বছর ধরে তাঁরা আর মামলার বিচারের কোনো খবর রাখতেন না। বহু বছর পর ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে পত্রিকায় তিন্নি হত্যা মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণের খবর জানতে পারেন তিন্নির চাচা সৈয়দ রেজাউল করিম। ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি ও তাঁর ভাই আদালতে হাজির হয়েছিলেন। পরে মাহবুব করিম ও রেজাউল করিম আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে তিন্নি হত্যার বিস্তারিত তথ্য আদালতকে জানান। রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বয়স হয়েছে। এখন আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারি না। তবে সব সময় মনে পড়ে তিন্নীর কথা। অভির কারণে তিন্নির সংসার তছনছ হয়ে গেল, জীবনটাও গেল। কিন্তু এখনো বিচার পেলাম না। আমি অভির বিচার চাই।’

কে এই অভি?

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে গোলাম ফারুক অভি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদকও হন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শেষ দিকে সরকারের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ রয়েছে। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বরিশাল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন।