জহুরিই চিনে নিতে পারেন রত্ন। নইলে বহুবার চাকরিচ্যুত ভবঘুরে চন্দ্রকুমার দের ওপর কেন চোখ পড়বে দীনেশচন্দ্র সেনের! তিনি কি আন্দাজ করেছিলেন, এই ছন্নছাড়া মানুষটির হাত ধরেই একদিন উঠে আসবে বাংলাদেশের আত্মার খবর, পূর্ব বাংলার লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ—শতবছর পরও যা উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বাংলার জীবনযাপনের দলিল হিসেবে।
ঠিক একশ বছর আগে মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করে চন্দ্রকুমার দে উন্মোচন করেছিলেন গ্রামের সাধারণ মানুষের অপূর্ব আনন্দ–বেদনার ইতিহাস, পল্লিবাংলার অক্ষয় ঐশ্বর্য। গীতিকা অক্ষয় হয়ে রইল, আর এর সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার চলে গেলেন প্রায় বিস্মৃতির অতলে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে নেত্রকোনার কেন্দুয়ার আইথর গ্রামে রামকুমার দে আর তারাসুন্দরী রানীর একমাত্র সন্তান হিসেবে চন্দ্রকুমারের জন্ম। পরিবার অভাবী, তবু সন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর প্রবল বাসনা ছিল মা–বাবার। পাঠশালায় কয়েক বছর যাতায়াত করে চন্দ্রকুমারকে ইতি টানতে হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার। হতে হলো গ্রামের মুদিদোকানের কর্মচারী।
খাতায় হিসাবের পরিবর্তে লিখতে শুরু করলেন ছড়া, কবিতা আর গাথা-গীতিকা। অগত্যা মালিকের গলাধাক্কা। এরপর শুরু হলো এ গ্রাম–ও গ্রাম ঘুরে গাথা-গীতিকার আসরে মনোনিবেশ। শুনতেন আর শুনে শুনে লিখেও রাখতেন সব। বৃদ্ধ বাবা ছেলের কাণ্ডে তিতিবিরক্ত। পুড়িয়ে দিলেন সব খাতাপত্র। দমে না গিয়ে আরও বেশি মনোযোগী হলেন চন্দ্রকুমার।
এরপর আরও দুবার একই ঘটনা ঘটেছে চন্দ্রকুমারের কর্মজীবনে। এর মধ্যে বয়স যখন ২৪, কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ময়মনসিংহের সৌরভ সাহিত্য পত্রিকায় ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রকুমার লিখলেন একটি নিবন্ধ। ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ নামের সেই লেখা পাঠকসমাদৃত হওয়ায় উৎসাহ বেড়ে গেল পল্লিসাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লেখার।
গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীর অধীনে তহশিল আদায়ের চাকরির ব্যবস্থা হলো। সেই সুবাদে তাঁর গ্রামগঞ্জে ঘোরার সুযোগ আরও বাড়ল। আবারও হিসাবের খাতায় লিপিবদ্ধ হতে লাগল পল্লির গায়েনদের গলায় গাওয়া উপাখ্যানের কথা। অতএব আবারও চাকরিচ্যুতি। ঠিক তখনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের হাতে পৌঁছাল সৌরভ পত্রিকাটি। তাঁর জহুরি চোখ চিনে নিল অমূল্য রত্নকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পালাগান সংগ্রহের জন্য চন্দ্রকুমারকে ৭০ টাকা মাইনায় চাকরি দিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। শুরু হলো চন্দ্রকুমারের ঐশ্বর্য সংগ্রহের পালা। সেই সংগ্রহের একটি বড় অংশ স্থান পেল ১৯২৩ সালে মৈমনসিংহ গীতিকার প্রথম প্রকাশে। পূর্ববঙ্গ গীতিকার চার খণ্ডে যে পালা মুদ্রিত হয়, তারও বেশ কটির সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। সংগ্রহ করেন গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে থাকা আরও অসংখ্য লোককাহিনি। ৫৭ বছরের জীবনের ৪০ বছরই তিনি এ কাজ করেন। এর অধিকাংশই ছাপার মুখ দেখেনি। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়েও গেছে পাণ্ডুলিপি।
চন্দ্রকুমার কেন্দুয়ার সাজিউড়া গ্রামের হিরণবালার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। নিঃসন্তান দম্পতি দত্তক নেন বিনয় সরকার ও জ্যোৎস্না রানী নামের দুই ছেলেমেয়েকে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পালিত সন্তানেরা ভারতে দেশান্তরের সময় জমিসহ গ্রামের বাড়িটি বিক্রি করে দেন। কেনেন সোনাফর উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির তিন ভাই।
সেখানে গিয়ে জানা গেল, চন্দ্রকুমারের ভিটায় এখন থাকেন সোনাফরের মেয়ে জোবেদা খাতুন। ৫৬ বছর বয়সী জোবেদা খাতুন জানালেন, বাবা-চাচাদের কাছে শুনেছেন, বাড়ি কেনার পর চন্দ্রকুমারের রেখে যাওয়া বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি, কাগজপত্রসহ বই পেয়েছিলেন। গুরুত্ব না বোঝায় এর কিছু ফেলে দেওয়া হয়, কিছু লাগে চুলায় আগুন ধরানোর কাজে।
চন্দ্রকুমারের স্মৃতি ধরে রাখতে বছরখানেক আগে জেলা পরিষদের উদ্যোগে আইথরে বাড়ির সামনে একটি ম্যুরাল তৈরি হয়েছে। চন্দ্রকুমার শেষজীবনে ময়মনসিংহ শহরের নওমহল চক শেহরা এলাকায় ছোট্ট একটি বাড়ি কিনেছিলেন। সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর সেটি বিক্রি করে দেন তাঁর দত্তক পুত্র। চন্দ্রকুমারের শেষকৃত্য হয়েছিল ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে কেওয়াটখালী শ্মশানঘাটে। স্বজনেরা সেখানে ছাতা আকৃতির একটি স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটি গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী।
চন্দ্রকুমার দের জন্মভিটায় লোকসংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের দাবিতে নেত্রকোনায় বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। গত বছর নেত্রকোনা সরকারি কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের উদ্যোগে গঠিত ফোকলোর পর্ষদ মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করে।
পর্ষদের সভাপতি অধ্যাপক আফজাল রহমান বলেন, ‘চন্দ্রকুমার কঠিন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বাংলা লোকসাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হলে তাঁর জন্মভিটায় লোকসংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।’ একই দাবি চন্দ্রকুমার দে সাহিত্য সংসদেরও।
এ বছর উদ্যাপিত হচ্ছে মৈমনসিংহ গীতিকা প্রকাশের শতবর্ষ। চন্দ্রকুমারের জীবনীকার অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, ‘চন্দ্রকুমার কেবল সংগ্রাহক ছিলেন না, ছিলেন একাধারে কবি, গল্পকার, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর কথা আমরা বিস্মৃত হয়েছি। বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ জানার জন্যই তাঁর পরিচয় উদ্ধার করা একান্ত প্রয়োজন।’