লোকগান ও লোকনাট্য
ভয় ও চাপে কমছে সাংস্কৃতিক আসর, অনিশ্চয়তায় শিল্পীরা
১৫ মাসে সাংস্কৃতিক আয়োজনে ১৩৫ বাধা।
২০৫ যাত্রাদলের মধ্যে সক্রিয় ৪০-৫০টি।
দুই দশকে গ্রামীণ লোকজ উৎসবের বড় অংশ বন্ধ।
ডিজিটাল বিনোদনও কমাচ্ছে মাঠভিত্তিক আয়োজন।
সিলেটের বিশ্বনাথের ইব্রাহিম শাহের মাজার। প্রায় শত বছর ধরে মাজারের পাশে বাউলগানের আয়োজন করা হয়। এ বছরও শুরু হয় গানের আসর। হঠাৎ শতাধিক লোক মঞ্চে এসে হামলা চালায়। বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও দর্শকদের চেয়ার ভাঙচুর করে। গত ২২ মার্চ রাতের এ হামলায় কয়েক মিনিটের মধ্যে পণ্ড হয়ে যায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী গানের আসর। ভবিষ্যতে গানের আসর বসালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেয় হামলাকারীরা।
বিশ্বনাথের এই চিত্র এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতির আয়োজন ঘিরে অনেকটা নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রামবাংলার লোকজ উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর এ ধরনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে অনেক উৎসব। কমছে সাংস্কৃতিক আয়োজন।
সামাজিক চাপ, ভয়, প্রশাসনিক জটিলতা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর আপত্তি। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা অগ্রাহ্য করাও সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।
যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, বাউলগান, পালাগান—এসব একসময় গ্রামীণ বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, গত দুই দশকে গ্রামবাংলার অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনমূলক এ ধরনের লোকসংস্কৃতি উৎসবের নিয়মিত আয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। লোকসংগীত ও লোকনাট্য এখন মূলত বিশেষ অনুষ্ঠান বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
একটি পরিসংখ্যান দেখলে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাধা প্রদানের চিত্র পাওয়া যায়। পুলিশের একটি শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে এ ধরনের ১৩৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসেই ৯৪টি ঘটনা ঘটেছে। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঘটেছে ১৬টি ঘটনা।
গ্রামীণ সাংস্কৃতিক উৎসব ও আয়োজনের পরিসর সংকুচিত হওয়ার পেছনে হামলা, বাধা ও সামাজিক চাপের মতো ঘটনাগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন শিল্পী ও আয়োজকেরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোথাও অনুষ্ঠান করতে গেলেই স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন, দল এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টি করার অভিযোগ আসছে।
একটি পরিসংখ্যান দেখলে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাধা প্রদানের চিত্র পাওয়া যায়। পুলিশের একটি শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে এ ধরনের ১৩৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসেই ৯৪টি ঘটনা ঘটেছে। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঘটেছে ১৬টি ঘটনা।
এ বিষয়ে নিয়ে কথা হয় বাউলশিল্পী আরিফ দেওয়ানের সঙ্গে। ‘মা লো মা’ গানটি তিনিই গেয়েছিলেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জে তাঁর পরিবার দুই শতকের বেশি সময় ধরে লোকসংস্কৃতির চর্চা করে আসছে।
আরিফ দেওয়ান বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় লোকসংস্কৃতির চর্চায় এ ধরনের বাধা ছিল না। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময় মাজারে হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আক্রমণসহ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি সংঘর্ষমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা লোকসংস্কৃতির ওপরও প্রভাব ফেলেছে। উগ্রবাদী সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠী এ কাজগুলো করছে। তবে সব ক্ষেত্রে বাইরের বাধাই একমাত্র কারণ নয়। কিছু শিল্পীর ‘প্রচারকেন্দ্রিকতা’ ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা অগ্রাহ্য করাও সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।
অর্ধযুগ ধরে যাত্রাপালা প্রদর্শনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার অনুমতি মিললেও নানা রকম বাধা আসে। এর ফলে মাঠভিত্তিক বড় আয়োজন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পীরা স্থানীয় পর্যায়ে ছোট অনুষ্ঠান, মন্দিরকেন্দ্রিক পালা বা মৌসুমি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।বেলায়েত হোসেন, সভাপতি, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ
কমছে সাংস্কৃতিক আয়োজন
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের শেষ দিক থেকে সাংস্কৃতিক আয়োজন তুলনামূলকভাবে কমতে থাকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠানের ওপর আঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিএনপি সরকার গঠনের পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। হামলা, বাধা ও লোকসংস্কৃতির চর্চার অভাবে এ ধরনের আয়োজনগুলো কমছে। তবে ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারও সাংস্কৃতিক আয়োজন কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন কেউ কেউ।
উদাহরণ হিসেবে যাত্রাপালার হিসাব ধরলেই গ্রামীণ আয়োজন সংকুচিত হওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পকলা একাডেমিতে নিবন্ধিত যাত্রাদলের সংখ্যা এখন কমবেশি ২০৫। তবে এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে নিয়মিত কার্যক্রমে অংশ নেয় ৪০-৫০টি দল। একসময় সারা দেশে মৌসুমে ২০ থেকে ৫০টি মাঠে যাত্রাপালা হতো, যেখানে মাসব্যাপী মেলায় প্রতিদিন একাধিক দল পালাক্রমে অভিনয় করত। এখন সেই চিত্র প্রায় নেই বললেই চলে।
জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) বাংলাদেশের বাউলগানকে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০০৮ সালে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ বাউলগানেরও এখন ভগ্নদশা।
চার বছর বয়স থেকে যাত্রার সঙ্গে যুক্ত লক্ষ্মী বণিকের কথায়ও উঠে আসে হতাশার সুর। প্রায় ৩৪ বছর ধরে যাত্রাপালায় কাজ করছেন তিনি। বাবা ছিলেন যাত্রাপালার ম্যানেজার, মা ছিলেন নৃত্যশিল্পী। গত শনিবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে বছরে ৫০-৬০ দিন কাজ ছিল। আর ছোটবেলায় ১০০ থেকে ১৫০ দিন কাজ পেতাম। এখন মাসে এক-দুই দিন কাজ পেলেই ভাগ্য ভালো বলতে হয়। অনেক জায়গায় গিয়ে আক্রমণের শিকারও হয়েছি। কোথাও কোথাও প্যান্ডেলে হামলা, আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।’ গত দেড় বছরে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ বলে জানান তিনি।
যাত্রাশিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংগঠন যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ জানিয়েছে, যাত্রাশিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত শিল্পীর সংখ্যা ৭ থেকে ৮ হাজার। এর মধ্যে পেশাদার যাত্রাশিল্পী ৫ হাজার এবং অপেশাদার কিংবা শখের বসে অনিয়মিতভাবে এই পেশার সঙ্গে আরও ২-৩ হাজার মানুষ সম্পৃক্ত। এই শিল্পনির্ভর পরিবার মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এই খাতের ওপর। কিন্তু আয়োজন কমে যাওয়ায় অনেকেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। ফলে নতুন শিল্পী যেমন পেশায় আসছেন না, পুরোনোরাও পেশা ছাড়ছেন।
কেবল সমতলেই নয়, সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে পাহাড়েও।
বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অর্ধযুগ ধরে যাত্রাপালা প্রদর্শনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার অনুমতি মিললেও নানা রকম বাধা আসে। এর ফলে মাঠভিত্তিক বড় আয়োজন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পীরা স্থানীয় পর্যায়ে ছোট অনুষ্ঠান, মন্দিরকেন্দ্রিক পালা বা মৌসুমি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
লোকসংগীতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে, অঞ্চলভেদে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধশত প্রকার লোকসংগীতের প্রচলন ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, মারফতি, বাউল, গম্ভীরা, কীর্তন, ঘাটু, ঝুমুর, বোলান, আলকাপ, লেটো, গাজন, বারমাসি, ধামালি, পটুয়া, সাপুড়ে, খেমটা প্রভৃতি ধারার শত শত গানের প্রচলন ক্রমেই কমছে।
এসব গানে একদিকে যেমন লোকজ জীবনধারা, তেমনি আধ্যাত্মিক ভাবনারও প্রতিফলন দেখা যায়। গানের বাণীতে জাতির অন্তর্জগতের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার পরিচয় মেলে। কিছু গানে ধর্মীয় আবেগের উপস্থিতি থাকলেও অধিকাংশ গান মূলত বিনোদনের জন্য পরিবেশিত হয়। আবার খেমটা, পটুয়া ও সাপুড়ে ধরনের গান অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীদের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মেয়েলি গীত, সহেলি গীত ও হুদমা গীতের মতো ধারায় নারীদের অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে সময়ের পরিবর্তনে অঞ্চলভিত্তিক এ গানগুলো আর আগের মতো নেই। যেমন বাউলগানের কথাই ধারা যাক। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) বাংলাদেশের বাউলগানকে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০০৮ সালে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ বাউলগানেরও এখন ভগ্নদশা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হচ্ছে ‘তৌহিদি জনতা’ নামে। অনেক সময় এসব অনুষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে অশ্লীলতার প্রচার এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ কিছু অভিযোগ আনা হচ্ছে। আবার কখনো কখনো দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসন সমস্যা মিটিয়ে অনুষ্ঠান চালু রাখার বদলে তা বন্ধ করে দেয়।
বাউলগানসহ লোকসংগীতের অন্যতম তীর্থস্থান মানিকগঞ্জ জেলা। জাতীয় তথ্য বাতায়ন বলছে, মানিকগঞ্জের গ্রামীণ জীবনের প্রতি পরতে পরতে জারিগান, সারিগান, বিচারগান, কবিগান, বাউলগান, মুর্শিদি, মারফতি, গাজীর গান, গাজনের গান, বেহুলার গান, ধুয়াগান, বারমাসি গীত, মেহেদি তোলার গীত, বিয়ের গীত, ঘেটু গান, মর্সিয়া, পাঁচালি, ওন্নি গান, ব্যাঙের বিয়ের গান ইত্যাদি মিশে আছে। দুই থেকে তিন যুগ আগেও মানিকগঞ্জের গ্রামীণ জনপদের বাড়ির আঙিনা, মাঠ আর বটের ছায়ায় বসত লোকসংগীতের প্রাণবন্ত আসর।
তবে মানিকগঞ্জের লোকসংস্কৃতির সেই চিত্র এখন হারিয়ে গেছে। এ নিয়ে কথা হয় জেলার অন্যতম প্রবীণ লোকসংগীত শিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতির সঙ্গে। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে। ১০ বছর বয়স থেকে গান শুরু করেন। জানালেন, দেশ স্বাধীনের আগেও ২০০-২৫০ জন ভালো মানের শিল্পী ছিলেন মানিকগঞ্জ জেলায়। ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা কমে এখন হাতেগোনা কয়েকজনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সাইদুর রহমান বয়াতি বললেন, ‘একসময় বাউল ও লোকসংগীত ছিল সাধনা ও দর্শনের বিষয়, কিন্তু এখন তা অনেকটাই পেশা ও ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অনেকেই নিজেকে বাউল হিসেবে পরিচয় দিলেও প্রকৃত বাউল জীবনাচার, দর্শন ও সাধনার সঙ্গে তাঁদের মিল নেই। ফলে গানের ভেতরের আধ্যাত্মিকতা ও গভীরতা কমে গেছে, মানুষের আগ্রহও হ্রাস পাচ্ছে।’
পুলিশের একটি শাখার হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে শুধু তৌহিদি জনতার ব্যানারেই অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে এনে বাধার মুখে পড়েছে ৩৬টি আয়োজন। এর বাইরে নাটক মঞ্চায়িত করাকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, বাউলগানের অনুষ্ঠানে বাধাদান ও শহীদ মিনার ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
পাহাড়ের উৎসবেও ভাটা
কেবল সমতলেই নয়, সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে পাহাড়েও। প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, ২০১৮ সাল থেকে বন্ধ আছে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো পার্বত্য অঞ্চলের রাজপুণ্যাহ উৎসব। জুমচাষি প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়, বার্ষিক সম্মিলনের মতো উৎসব করা হতো।
একইভাবে পারিবারিক সমৃদ্ধি কামনায় ম্রোদের চিয়াসদ পই বা গোহত্যা উৎসব এখন প্রায় বিলুপ্ত। মারমা সম্প্রদায়ের গীতিনাট্য ‘জ্যাত’ ও ‘কাপ্যা, যা মূলত পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে পরিবেশিত হতো, ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও প্রায় প্রতিটি পাড়ায় নিয়মিত আয়োজন করা হতো। বর্তমানে এসব আয়োজন আর দেখা যায় না।
একইভাবে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘গড়াইয়া’ নাট্যোৎসবও এখন আর আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয় না। এটি এখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে। চাকমা সম্প্রদায়ের ‘গেংহুলী’ পালাগানের আসরও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় এই পালাগানের গায়কেরা রাতভর বেহালা বাজিয়ে গান পরিবেশন করতেন এবং শ্রোতারা সারা রাত মুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করতেন।
অন্যদিকে বম সম্প্রদায়ের ‘শেয়াকিডং’ বা শিকারের উৎসব এবং খুমি সম্প্রদায়ের যুদ্ধনৃত্যের উৎসবও এখন খুব কম দেখা যায়। সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক রূপান্তর এবং আয়োজনের ঘাটতির কারণে এসব ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চর্চা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শিল্পী ও কলাকুশলীরা জানিয়েছেন, যাত্রাপালার আয়োজন ঘিরে কিছু ক্ষেত্রে অশ্লীলতার ঘটনা ঘটেছে। আবার দু-একটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভুল–বোঝাবুঝিও ছিল। তবে পুরো শিল্পের ওপর এর দায় দিয়ে দেওয়ার একধরনের প্রবণতা আছে।
বাধা-হামলা কেন, কারা করছে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হচ্ছে ‘তৌহিদি জনতা’ নামে। অনেক সময় এসব অনুষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে অশ্লীলতার প্রচার এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ কিছু অভিযোগ আনা হচ্ছে। আবার কখনো কখনো দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসন সমস্যা মিটিয়ে অনুষ্ঠান চালু রাখার বদলে তা বন্ধ করে দেয়।
যেমন গত বছরের এপ্রিলে চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর মহিলা সমিতি মিলনায়তনে টানা দুই দিন নাট্যদল প্রাঙ্গণেমোর প্রযোজিত শেষের কবিতা নাটকের প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। সব প্রস্তুতি শেষ করে নাট্যকর্মীরা অপেক্ষায় ছিলেন মঞ্চে ওঠার। কিন্তু ‘তৌহিদি জনতার’ হুমকির চিঠি পেয়ে নাটকের প্রদর্শনী বাতিল করা হয়।
পুলিশের একটি শাখার হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে শুধু তৌহিদি জনতার ব্যানারেই অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে এনে বাধার মুখে পড়েছে ৩৬টি আয়োজন। এর বাইরে নাটক মঞ্চায়িত করাকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, বাউলগানের অনুষ্ঠানে বাধাদান ও শহীদ মিনার ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে অনেক স্থানে নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমতি পেতে আগে থেকেই স্ক্রিপ্ট জমা দিতে হচ্ছে। ময়মনসিংহে এভাবে স্ক্রিপ্ট জমা দিয়ে অনুমতি পাওয়ার পরেও মব করার হুমকি এসেছে। পরে সেই নাটকের আয়োজন বাতিল করতে হয়েছে।পলি পারভীন, নাট্যকর্মী
শিল্পী ও কলাকুশলীরা জানিয়েছেন, যাত্রাপালার আয়োজন ঘিরে কিছু ক্ষেত্রে অশ্লীলতার ঘটনা ঘটেছে। আবার দু-একটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভুল–বোঝাবুঝিও ছিল। তবে পুরো শিল্পের ওপর এর দায় দিয়ে দেওয়ার একধরনের প্রবণতা আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী যাত্রশিল্পী নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ২০১২-১৩ সালের পর থেকে যাত্রার পরিবেশ দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। আয়োজকেরা শিল্পীদের খোলামেলা নৃত্যের জন্য বাধ্য করতে থাকেন। শিল্পীদের বাইরে শুধু নাচের জন্য বাইরে থেকে মেয়েদের নিয়ে আসা হতো। এভাবে যাত্রায় অশ্লীল নাচ ঢুকে পড়ে। এতে প্রকৃত শিল্পীদের সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বদনামের ভয়ে তিনি বাধ্য হয়ে নাচ ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, অশ্লীলতা বন্ধ করে প্রকৃত শিল্পীদের জন্য কাজের সুন্দর পরিবেশ তৈরি করলে যাত্রাশিল্প বেঁচে যেত।
আবার উৎসবগুলোকে ঘিরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলোকে হুমকির মুখে ফেলছে। গত ৩১ মার্চ এমন একটি ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায়। সেখানে সাত দিনব্যাপী এক মেলায় সাধক হজরত শাহ সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবার মাজারের খাদেম (সেবক) মতিউর রহমান ওরফে লাল মিয়াকে (৬০) কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। মতিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মাদক সেবন ও জুয়া খেলায় বাধা দেওয়ায় তাঁকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়।
লোকসংস্কৃতির ওপর বাড়তে থাকা হামলা ও বাধার পেছনে মূলত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব কাজ করছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি ছিল বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সেই ধারার সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সুফি ঐতিহ্যভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন একধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে মাজার, ওরস বা লোকজ আয়োজনের ওপর আক্রমণে রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে স্থান দখল, আধিপত্য ও রাজনৈতিক স্বার্থও যুক্ত হয়েছে, ফলে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।সামিনা লুৎফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকর্মী
এমন ঘটনার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরোধিতা, লোকসংস্কৃতির ঐতিহাসিক মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞতা বা অসচেতনতা এবং কোথাও কোথাও রাজনৈতিক কারণেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
যেমন গত বছরের ৭ অক্টোবর সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘নাচ-গান হওয়ার খবর শুনে’ একদল ব্যক্তি বাধা দিতে যান। পরে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে তাঁদের জানানো হয়, নাচ-গান নয়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর অনুষ্ঠান হবে। সেটা শুনে তাঁরা চলে যান।
মঞ্চ নাটকসহ সাংস্কৃতিক আয়োজনে শিল্পীরা কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হন, তা উঠে এসেছে নাট্যকর্মী পলি পারভীনের বক্তব্যে। নাট্যদল আরশিনগরের এই সদস্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে অনেক স্থানে নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমতি পেতে আগে থেকেই স্ক্রিপ্ট জমা দিতে হচ্ছে। ময়মনসিংহে এভাবে স্ক্রিপ্ট জমা দিয়ে অনুমতি পাওয়ার পরেও মব করার হুমকি এসেছে। পরে সেই নাটকের আয়োজন বাতিল করতে হয়েছে।
‘ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে’
শিল্পী ও আয়োজকেরা বলছেন, লোকসংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়; এটি গ্রামীণ সমাজের স্মৃতি, বিশ্বাস ও পরিচয়ের ধারক। কিন্তু হামলা, বাধা, সামাজিক চাপ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার চাপে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ছে। মাঠ ফাঁকা হচ্ছে, মঞ্চ নিভছে, পেশা ছাড়ছেন শিল্পীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকর্মী সামিনা লুৎফা প্রথম আলোকে বলেন, লোকসংস্কৃতির ওপর বাড়তে থাকা হামলা ও বাধার পেছনে মূলত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব কাজ করছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি ছিল বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সেই ধারার সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সুফি ঐতিহ্যভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন একধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে মাজার, ওরস বা লোকজ আয়োজনের ওপর আক্রমণে রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে স্থান দখল, আধিপত্য ও রাজনৈতিক স্বার্থও যুক্ত হয়েছে, ফলে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকগুলো হামলার ঘটনা কার্যকরভাবে দমন না করায় তা সহিংসতাকে উৎসাহিত করেছে। এমন মন্তব্য করে সামিনা লুৎফা বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে হামলা বন্ধে আইনের শাসন জোরদারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে কথার সঙ্গে প্রয়োগের মিল এখনো স্পষ্ট নয়। রাষ্ট্র সক্রিয় না হলে সাংস্কৃতিক পরিসরে এই ভয়ের পরিবেশ কাটবে না।