টেলিটক থাকায় বেসরকারি অপারেটরগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারে না: মন্ত্রী
লোকসান দিলেও টেলিকম বাজারে ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন টেলিটকের গুরুত্ব দেখালেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেছেন, টেলিটক থাকায় বেসরকারি অপারেটরগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারে না। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পেলে টেলিটককে গ্রামীণফোন ও রবির মতো শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আজ শনিবার সকালে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ: নতুন সরকার কী ভাবছে’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মন্ত্রী এ কথা বলেন। বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
নতুন সরকার টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ শুরু করেছে জানিয়ে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফ্রিল্যান্সিং খাত নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে তরুণদের দক্ষ করে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়।
মন্ত্রী জানান, সরকার লাস্ট-মাইল ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পাহাড়ি ও চরাঞ্চলে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট, বিভাগীয় শহর ও শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫জি সম্প্রসারণ এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো শেয়ারিং ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকার টেলিকম খাতে উচ্চ করহার, ভ্যাট ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ বলেন, ‘আমরা হয়তো সব সমস্যা এই বাজেটে সমাধান করতে পারব না। তবে ধারাবাহিকভাবে সমাধানের জন্য আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারব। আমাদের মূল লক্ষ্য গ্রাহক কতটা লাভবান হচ্ছে তা দেখা।’
আগামী পাঁচ বছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) আইসিটি ও টেলিকম খাতের অবদান বর্তমান ৬ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এই খাতে পাঁচ বছরের জন্য শুল্ক ও করনীতিতে পূর্বানুমানযোগ্য রোডম্যাপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দেশে ৪জি-৫জি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সাশ্রয়ী ডিভাইস নিশ্চিত করাও জরুরি। এ জন্য পাঁচ-ছয় হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদন ও কিস্তিতে (ইএমআই) সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী বৈঠকে বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা করা হয়েছে। ফলে কোনো অপারেটরের একক আধিপত্য থাকবে না।
গোলটেবিল আলোচনায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম। তিনি বলেন, শক্তিশালী ভিত্তি থাকলেও ডিজিটাল অর্থনীতি বিনির্মাণ, প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে জরুরি নীতি সংস্কার প্রয়োজন। টেলিকম রপ্তানি, উৎপাদন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও এআই অর্থনীতির ভিত্তি। কিন্তু তা সত্ত্বেও টেলিকম রেগুলেটরি ব্যবস্থা এখনো পিছিয়ে।
প্রবন্ধে টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়নে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন সাহেদ আলম। সেগুলো হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য পূর্বাভাসযোগ্য রাজস্বকাঠামো, আধুনিক তরঙ্গ নীতি, দ্রুত একক উইন্ডোতে অনুমোদন ও অবকাঠামো ভাগাভাগি, টেলিকম, ব্রডব্যান্ড ও ডেটা সেন্টার নীতির জাতীয় সমন্বয় এবং সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা গভর্ন্যান্স। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ডেটা ট্রাফিকের ব্যয়ভার বহনে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ন্যায্য বাণিজ্যিক অবদানের দাবি জানান সাহেদ আলম।
বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। আরও বক্তব্য দেন মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার, বুয়েটের অধ্যাপক ও টেলিকম–বিশেষজ্ঞ লুৎফা আক্তার, বাংলালিংকের হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স তাইমুর রহমান, টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দে।