কক্সবাজারের বনে মেঘলা চিতার সন্ধান, মিলেছে আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণী

তিনটি ক্যামেরায় মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি ধরা পড়েছেছবি: বন বিভাগের সৌজন্যে

পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন বনে আকস্মিক দেখা মিললেও প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের একটি সংরক্ষিত বনে গবেষকদের ক্যামেরা ট্র্যাপে (বনের ভেতর স্থাপিত ক্যামেরা) দেখা মিলেছে মেঘলা চিতার (ক্লাউডেড লেপার্ড)। এ মাসের শুরুতে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশনে’ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন মেঘলা চিতাকে মহাবিপন্ন (ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড) হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছে। এর মানে হলো মেঘলা চিতা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে মহাবিপন্ন হলেও বৈশ্বিকভাবে আইইউসিএনের তালিকায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আছে।

কক্সবাজার ছিল এক সময়ের সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এ বন ছিল বন্য প্রাণীর আদর্শ আবাসস্থল। গত এক দশকে বনাঞ্চলজুড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি, রেললাইন নির্মাণ ও হাজার হাজার একর বনভূমির জবরদখলে প্রতিনিয়ত কমছে বনের জীববৈচিত্র্য। এর মধ্যে ইনানী জাতীয় উদ্যানে প্রথমবারের মতো মেঘলা চিতা পাওয়ার খবর নতুন করে বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে আশাবাদ তৈরি করছে বলে মনে করছেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

শুধু মেঘলা চিতাই নয়, ওই গবেষণায় উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, বনবিড়াল, চিতা বিড়ালসহ আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর—মোট ১৩ মাস ধরে কক্সবাজারে একটি সংরক্ষিত বনে এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বন অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব গেটিনয়েন।

বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাস এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানের আয়তন ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। এখানে ১৫টি ক্যামেরায় ৩২ স্থানকে গবেষণায় আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে তিনটি ক্যামেরায় মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি ধরা পড়েছে। এর বাইরে পায়ের ছাপ ও মল থেকে মেঘলা চিতার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বনের ভেতর যেখানে জলাশয় ও পানির প্রবাহ আছে সেখানে বন্য প্রাণীর উপস্থিতি অন্যান্য অংশের চেয়ে বেশি।

২০২৩ সালে রাঙামাটি জেলায় পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া একটি মেঘলা চিতা কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে রাখা হয়েছে।

বন্য প্রাণী সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘলা চিতার উপস্থিতি প্রমাণ করে কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে এখনো এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। উদ্যানের ৭ হাজার হেক্টরের মধ্যে ৩ হাজার হেক্টর বনাঞ্চলকে মেঘলা চিতার বসবাসের উপযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে ইনানী জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৪৪ শতাংশ। মূলত গাছের সঙ্গে থাকা ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে এদের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। গবেষণায় এ ধরনের গাছ ও ঝোপঝাড়সমৃদ্ধ বন পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর।

মেঘলা চিতা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনভূমিতে বসবাসকারী একটি মাঝারি আকারের বন্য প্রাণী। এর শরীরের বড় বড় মেঘের মতো ছোপের কারণে এর নাম হয়েছে মেঘলা চিতা। এটি দিনের অধিকাংশ সময় গাছের ওপর কাটায়। এর শিকারের তালিকায় আছে বানর, পাখি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। তাদের গোড়ালির সন্ধিগুলো অত্যন্ত নমনীয় এবং প্রায় ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে। ফলে তারা গাছের খাড়া কাণ্ড বেয়ে মাথা নিচের দিকে রেখে দৌড়ে নামতে পারে।

জানতে চাইলে বন্য প্রাণী গবেষক রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, মেঘলা চিতা খুবই বিরল একটি বন্য প্রাণী। ইনানীর বনে এটির উপস্থিতি বন্য প্রাণী সংরক্ষণে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সরকারের উচিত মেঘলা চিতার বসবাসের এলাকাকে চিহ্নিত করে বিশেষভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া। এখানে কাঠ আহরণ বন্ধ ও বসতি থাকলে সরিয়ে নেওয়া।

এক সময় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বন অবিভক্ত ছিল। ব্রিটিশ আসার পর এসব বন খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে জানিয়ে রেজা খান বলেন, এ চিতা গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে শিকার ধরে। মাটিতে নামে খুবই কম। ইনানীর বনে এ চিতাই এখন টপ-প্রিডেটর (শীর্ষ শিকারি)। তাই এটির আবাসস্থলকে সুরক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি।

আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণী

মেঘলা চিতার বাইরে গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ২১টি বন্য প্রাণীর তথ্য। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, শজারু, বানর (রেসাস মেকাক), শিয়াল, গন্ধগোকুল, ছোট খাটাশ, বড় খাটাশ, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, শূকর, কাঁকড়াভুক বেজি, গোরখোদক, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, গেছো চুছো, মায়া হরিণ, দাঁতাল ফেরেট বেজার, ছোট রক্তপেকো বাদুড়, বাদামি কাঠবিড়ালি, লজ্জাবতী বানর, লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি।

উদ্যানের ঝুঁকি কমানোর সুপারিশ

গবেষণায় বন্য প্রাণী সমৃদ্ধ ইনানী জাতীয় উদ্যানের চারপাশে বেশ কয়েকটি হুমকি চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে মানুষের বসতি স্থাপন, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সম্প্রসারণ, বনের গাছ কেটে জ্বালানি সংগ্রহ এবং কৃষিজমির অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। মানুষের আনাগোনা আছে বা কৃষিনির্ভর এলাকায় বন্য প্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য আশঙ্কাজনকভাবে কম পাওয়া গেছে।

ইনানি বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গবেষকেরা দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে বনের ভেতরের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বনভূমি দখল বন্ধ করা, বন্য প্রাণীদের সুপেয় পানির একমাত্র উৎস পাহাড়ি ছড়া ও খালগুলোকে রক্ষা করা এবং পানির প্রবাহ সচল রাখা। এ ছাড়া উদ্যানের চারপাশে বাফার জোন তৈরি করে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে গবেষণায়। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ইনানী জাতীয় উদ্যানের উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।