হামে মৃত্যু ১১০০ পার, দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জনস্বাস্থ্যবিদদের

হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসা নিচ্ছেফাইল ছবি

বিয়ের প্রায় ১১ বছর পর ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতি প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছিলেন। নাম রাখা হয়েছিল ফাইয়াজ হাসান তাজিম। মা ছেলের নামে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম রাখেন ‘তাজিম এর আম্মু’। ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী তাজিম হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় গত ২২ এপ্রিল। টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া তাজিমের জন্মদিন ছিল ৪ আগস্ট। তাজিমের মতো শিশু মৃত্যুর সংখ্যা হাজার পার হওয়ার পর ফারজানা ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘হামে মৃত্যু এক হাজার পার হইছে। দেখতেছি তো। এ নিয়ে বলে তো কোনো লাভ হবে না। বাঁচতে হবে, তাই আমরা সন্তানহারা মা-বাবা বাধ্য হয়ে বেঁচে আছি।’

এ রকম কষ্ট বুকে নিয়ে এভাবে বেঁচে থাকা মা–বাবার সংখ্যা আরও বেড়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় অর্থাৎ গতকাল সোমবার থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হামে প্রাণ গেছে আরও পাঁচজনের। সব মিলিয়ে হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত মৃত্যু কখনোই হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি আগে; বরং বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ওই রোগ প্রায় নির্মূলের পথে ছিল বাংলাদেশ।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই এ ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে অবহেলায় প্রায় ভুলে যাওয়া হাম বীভৎস চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। বর্তমান সরকারের সময় চিকিৎসায় গাফিলতি এবং হামের গণটিকাদানের সময় অন্তত ৪০ লাখ শিশুর বাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনায় হাম আরও বেড়েছে। দেশের নানা প্রান্তে হামে সন্তান হারানোর কান্না এখন নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক দম্পতির দুই সন্তানের হামে মৃত্যু

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের খুমি জাতিগোষ্ঠীর তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির দুই ছেলে চার বছর বয়সী প্রেলং খুমি ও সাত বছর বয়সী খ্রেতং খুমিকে রুমা উপজেলার লেংটংপাড়ায় পাশাপাশি দুটি কবরে সমাহিত করা হয়। ২৫ জুলাই খ্রেতং আর ২৭ জুলাই প্রেলংয়ের মৃত্যু হয়। তৈসাং ও নাংয়ো দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দুই সন্তান পরপর মারা যায় হামের উপসর্গ নিয়ে। এক রোববার খ্রেতংকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছিল, দুই দিন পর মঙ্গলবার তার পাশেই প্রেলংকে কবর দেওয়া হয়। দুই ছেলের মৃত্যু ও শেষকৃত্যের শোক আর ধকল সয়ে নেওয়ার সময় পাননি এই দম্পতি। আক্রান্ত আরও দুই সন্তানকে নিয়ে পরদিন রাতে জেলা সদর হাসপাতালে আসেন। সেখানেই এখন ভর্তি ১১ বছরের ছেলে পথাং এউং ও সাত মাস বয়সী মেয়ে লিংথং এ খুমি।

চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রকোপ বাড়তে থাকে। কিন্তু উদাসীন ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। মার্চে এসে হামের প্রকোপ ব্যাপক হারে বাড়তে শুরু করে। সরকারের নির্বিকার ভাব তবু যায়নি।

চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যু ও সংক্রমণ আগে ঘটেনি। আবার গণটিকাদানের পর হামে এত সংক্রমণ বিশ্বে বিরল। এ ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় অবহেলার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলেছেন বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। এই অবহেলার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং বিচারের মুখোমুখি করার দাবি তাঁর। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকায় অবহেলা করা হয়। এ সরকারের সময় চিকিৎসা এবং টিকা উভয় ক্ষেত্রেই অবহেলা করা হয়। এসব অবহেলার দায় নিতেই হবে।

আরেক জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ মনে করেন, হাম প্রতিরোধে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর দায় নিয়ে পদত্যাগের কথা বিবেচনা করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সংক্রমণ, ইতিহাসে সর্বোচ্চ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য দেখাচ্ছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি। বিশ্বজুড়ে হাম ও রুবেলা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তর জেনেভায় নিয়মিত যে প্রাথমিক উপাত্ত জমা হয়, সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে প্রথম আলোর পক্ষে সেই তথ্য সংগ্রহ করে এই চিত্র দেখা গেছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও (সিডিসি) বিশ্বে হাম সংক্রমণের পরিস্থিতি জানাতে জুলাই মাসে তৈরি করা ডব্লিউএইচওর নজরদারি প্রতিবেদনটি ব্যবহার করেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছয় মাসে হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এ সময়ে দেশটিতে হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ২৬ হাজার ৬০৭ জন। যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেন ১৪ হাজার ৫২১ রোগী নিয়ে রয়েছে তৃতীয় স্থানে। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে এরপর রয়েছে মেক্সিকো (১২,৪৯৫), পাকিস্তান (১১,০৩৭), ক্যামেরুন (৯,৬৫৩), কাজাখস্তান (৭,৭৩০), গুয়াতেমালা (৬,৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬,৮১৫) ও সুদান (৫,৭৬৬)।

জুলাই মাসের পর থেকে হামের সংক্রমণ কমেনি। আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৫১০ জন। আর হামে আক্রান্ত হয়েছে ২১ হাজার ৩৯২ জন। সব মিলিয়ে হাম রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ১১ হাজার ৯০২। বাংলাদেশে গত বছর (২০২৫) হাম রোগী ছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন।

বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত সংক্রমণের রেকর্ড নেই।

টিকাদানে ঘাটতি ও বিপদ

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কাভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

২০২০-২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।

ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।

জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া ৫ মে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

অবহেলায় মৃত্যু ও দায়ীদের বিচার

জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, যে হামকে নির্মূলের পথে ছিল বাংলাদেশ, সেখানে এত সংক্রমণ ও মৃত্যু সরকারগুলোর অবহেলার ফল। হাম যখন মারাত্মক রূপ নিচ্ছিল, তখন একে মহামারি ঘোষণার দাবি উঠেছিল জনস্বাস্থ্যবিদদের পক্ষ থেকে। কিন্তু সরকার এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। যদি মহামারি ঘোষণা হতো, তাহলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, মহামারি ঘোষণা করলে কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে বার্তা যেত। হামের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হতো। সরকার যে টিকার সংকটের কথা বলেছে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশে মহামারি ঘোষণায় তারাও সজাগ হতো এবং দ্রততার সঙ্গে টিকার বন্দোবস্ত হতে পারত।

বে-নজির আহমেদ বলেন, সরকার স্রেফ জেদের বশে হামকে মহামারি ঘোষণা করল না। কেন্দ্র বা মাঠে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, যাতে এত বড় একটি মহামারি ঠেকানো যায়। কোনো জবাবদিহিমূলক সরকার যদি হতো, তবে নিজের দায় স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করতেন। কিন্তু সেই জবাবদিহি তো নেই। এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের বিষয় বিবেচনায় নিতে পারেন।

গণটিকায় বাদ লাখো শিশু, আবার বিপদ শুরু

হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি যখন মারাত্মক রূপ নিল, তখন চলতি বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়। বিষয়টি প্রকাশের পর জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলতে থাকেন, এত শিশুর বাদ পড়া খুবই মারাত্মক। কারণ, তারা শুধু নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলবে।

বাস্তবেও হয়েছে তা–ই। গণটিকা দেওয়ার চার মাস পার হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু কমেনি। এমন চিত্র বিশ্বে বিরল বলে জানান জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, গণটিকা দেওয়ার পর এত মৃত্যু, এটা সম্ভবত বাংলাদেশে বেশি। অন্য কোথাও এমন অবস্থার কথা শুনিনি।

দায়ীদের চিহ্নিত করা দরকার

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং শত শত শিশুর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এর কারণ অনুসন্ধানের দাবি করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। সরকারের মন্ত্রীসহ একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি তদন্তের কথা বলেছিলেন।

বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে হামের এ পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে ব্যবস্থা নেওয়ার কিছু কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কথাতেই সব শেষ হয়েছে। বাস্তবে কোনো কিছু করা হয়নি। এ ধরনের একটি তদন্ত হলে আমাদের ভবিষ্যতের সমস্যা সমাধানে করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা পাওয়া যেত; কিন্তু এখন হাম পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণ দরকার। দায়ীদের চিহ্নিত করা দরকার।’