চট্টগ্রামে আরেক ‘জঙ্গল সলিমপুর’

পাহাড়ের ঢাল ও খাঁজে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে টিনের ঘরগুলো। সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর বরইতলী এলাকায়ছবি : জুয়েল শীল

সরু মেঠো পথ পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠেছে। দুই পাশে টিন, বাঁশ আর বেড়ার ছোট ছোট ঘর। কোনোটি পাহাড়ের ঢালে ঠেস দিয়ে, কোনোটি পাহাড় কেটে সমান করা জায়গায়। কোথাও নতুন ঘরের কাঠামো উঠছে, কোথাও সদ্য কাটা মাটি। কয়েকটি স্থানে পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি।

চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বরইতলী এলাকায় সম্প্রতি গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেল। নগরের সীমানার ভেতরে হলেও সেখানে যেতে হয় হাটহাজারীর বড় দিঘিরপাড় থেকে ভাটিয়ারী সংযোগ সড়ক ধরে। ৩ নম্বর বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকলেই পাহাড়ঘেরা বরইতলী।

আরও পড়ুন

ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৪০ নম্বর বিএস দাগের মধ্যে মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি ভূমি। এর মধ্যে ৩৫৯২ দাগের শ্রেণি ‘টিলা’, ৩০৫৩ দাগের ‘ছন খোলা’ এবং অন্য দুটি দাগের ‘নাল’। তবে সরেজমিন এসব এলাকার বড় অংশে পাহাড় রয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে, শুধু বরইতলীতেই তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করে। আশপাশের পাহাড়েও কয়েক শ ঘর রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ না থাকায় মোট পরিবার বা দখলে যাওয়া জমির সঠিক হিসাব নেই। তবে সরেজমিন ও স্যাটেলাইট ছবিতে পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বসতি দেখা যায়।

আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্রুত সেখানে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার সবাই ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ছোট জায়গা নিয়েছেন। তাঁদের কেউ মালিকানার বৈধ দলিল দেখাতে পারেননি। পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা সাত লাখ টাকায় হাতবদলের লিখিত কাগজও পেয়েছেন এই প্রতিবেদক।

সরকারি নথিতেও পাহাড় কাটার প্রমাণ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থান পরিদর্শন করে ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট বা প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছে। এটি পুরো এলাকার হিসাব নয়।

বরইতলীসহ জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের গড়ে ওঠার শুরুর দিকের মিল পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গল সলিমপুরেও পাহাড় দখল করে প্লট তৈরি, টাকার বিনিময়ে হাতবদল এবং পরে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছিল। কয়েক দশকে সেটি বিশাল জনপদে পরিণত হওয়ায় উচ্ছেদও জটিল হয়ে পড়ে। জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এখনো সেই পর্যায়ে যায়নি। তবে এখানেও সরকারি জমিতে বসতি, পাহাড় কেটে জায়গা তৈরি ও হাতবদলের একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্রুত সেখানে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।’

আরও পড়ুন

পাহাড় কেটে প্লট

বরইতলীতে বসতির শুরু প্রায় চার দশক আগে। মোহাম্মদ মানিক ১৯৮৬ সালের দিকে ৩ নম্বর বাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর ভাষ্য, তখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ঘর ছিল। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সন্দ্বীপ, হাতিয়াসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ এসে বসতি গড়তে শুরু করেন। এরপর ধাপে ধাপে ঘর বাড়ে।

পাহাড়ের ওপর পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিমের ঘর। তিন বছর আগে প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে জায়গা নেন তিনি। রহিম বলেন, ‘আমরা নিজেরা পাহাড় কাটিনি। যারা জায়গা বিক্রি করেছে, তারাই পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে বুঝিয়ে দিয়েছে। কোনো কাগজ দেয়নি।’

৫০ টাকার স্ট্যাম্পে করা একটি ‘হস্তান্তর দলিল’ও পেয়েছেন এই প্রতিবেদক। ওই কাগজ অনুযায়ী, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর মনোয়ারা বেগম পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা সাত লাখ টাকায় মো. সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী সুরমা আক্তারের কাছে হস্তান্তর করেন। জমির শ্রেণি লেখা হয়েছে ‘টিলা’। তবে এটি নিবন্ধিত মালিকানা দলিল নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ওই স্থানে পাহাড় কাটার ঘটনায় সাইফুলকে জরিমানাও করা হয়েছে।

জায়গা কেনার কথা ক্রেতারা বললেও অধিকাংশই বিক্রেতাদের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সঙ্গে ১৪ জনের সম্পৃক্ততার কথা এসেছে। তাঁদের মধ্যে যাঁদের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়েছে, তাঁরা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ—কেউ গাড়িচালক, কেউ পোশাকশ্রমিক, কেউ রংমিস্ত্রি, কেউ দিনমজুর।

জঙ্গল সলিমপুরেও পাহাড় দখল করে প্লট তৈরি, টাকার বিনিময়ে হাতবদল এবং পরে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছিল। কয়েক দশকে সেটি বিশাল জনপদে পরিণত হওয়ায় উচ্ছেদও জটিল হয়ে পড়ে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন পাহাড় কাটা ও নতুন ঘর নির্মাণে প্রভাব খাটাতেন। অভিযোগের পক্ষে লিখিত নথি পাওয়া যায়নি। গাজী শফিউল আজমের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন

হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত হিসেবে মোহাম্মদ হোসাইনের নাম রয়েছে। নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দেওয়া হোসাইন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘ষড়যন্ত্রমূলক’।

আমরা নিজেরা পাহাড় কাটিনি। যারা জায়গা বিক্রি করেছে, তারাই পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে বুঝিয়ে দিয়েছে। কোনো কাগজ দেয়নি।
পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিম

বর্তমানে পাহাড় কাটা ও জায়গা হাতবদলে মো. রুবেলের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। নিজেকে হাটহাজারী উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সহদপ্তর সম্পাদক পরিচয় দেওয়া রুবেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে বরইতলীতে একটি জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করেন তিনি।

রুবেলের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন আবুধাবিতে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরহাদ। গত ২৭ জুলাই এ নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিত অভিযোগও করেছেন তিনি। রুবেল এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি এবং পরে সেই বসতির আড়ালে ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে সমতল করা পাহাড় দখলের একটি পরিচিত প্রবণতা। তাঁর মতে, জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে এখনই পাহাড় কাটা ও দখল বন্ধ করতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন

উচ্ছেদ নেই, শুধু জরিমানা

বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে গত ১০ বছরে বরইতলীতে কোনো উচ্ছেদ অভিযানের তথ্য পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের জুনে পাহাড় কাটার অভিযোগের পর এলাকা পরিদর্শন করে হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিস। তাদের চিঠির ভিত্তিতে ২৮ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায়। ৪ আগস্ট ১৪ জনকে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

কিন্তু জরিমানার পরও কাটা পাহাড়ে ঘর রয়ে গেছে, খাসজমিও দখলমুক্ত হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, সরকারি খাসজমি কীভাবে একটি চক্র লিজ দিচ্ছে বা কেনাবেচা করছে, সেটি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এবং জমি সরকারের দখলে নিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে চিঠি লেখা হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি এবং পরে সেই বসতির আড়ালে ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে সমতল করা পাহাড় দখলের একটি পরিচিত প্রবণতা। তাঁর মতে, জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে এখনই পাহাড় কাটা ও দখল বন্ধ করতে হবে।